কক্সবাজারের দায়রা জজকে হাইকোর্ট

এভাবে জামিন দিলে বিচারিক নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নামঞ্জুরের দিনই ৯ আসামিকে জামিন

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩, ০৩:০১

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জামিন না-মঞ্জুরের দিনই আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনের মামলার নয় আসামিকে জামিন দেওয়ার ঘটনায় কক্সবাজারের দায়রা জজকে ভর্ৎসনা করেছে হাইকোর্ট। তলব আদেশে আদালতে হাজিরার পর দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলকে উদ্দেশ্য করে হাইকোর্ট বলেছে, কোনো প্রসিডিং অনুসরণ না করেই আসামিদের নিজের ইচ্ছেমতো জামিন দিয়েছেন। আপনি তো নিজেও একসময় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। এখন জেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিচারক। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদেশের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে যদি এভাবে জামিন দেন তাহলে বিচারিক নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে। বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ মন্তব্য করে।

এদিকে জেলা জজ তার কর্মকাণ্ডের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান। জেলা জজ হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। কিছুদিন পরেই অবসরে যাব, সম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে চাই। তখন হাইকোর্ট বলে, আপনি তো সম্মানজনক বিদায় চান না। আপনার কাজকর্মে তা মনে হয় না। বিদায় নেওয়ার সময় কী বার্তা দিয়ে যাবেন? মনে হচ্ছে আপনাকে বদনাম নিয়েই বিদায় নিতে হবে। জেলা জজ বলেন, ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কাজ করব না।

জেলা জজকে উদ্দেশ্য করে হাইকোর্ট বলে, আপনি এর আগেও আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কয়েক জনকে জামিন দিয়েছেন। সেই খবরও আমাদের কানে এসেছে। জেলা জজ বলেন, তিন বছরে মাত্র চার জনকে এভাবে জামিন দিয়েছি। অনেক সময় আইনজীবী নেতারা এসে চাপ সৃষ্টি করেন। তখন শুনতে হয়। হাইকোর্ট বলে, আপনি কি উনাদের চাকরি করেন, নাকি সরকারের চাকরি করেন? এ সময় নিশ্চুপ থাকেন জেলা জজ।

হাইকোর্ট বলে, কে চেয়ারম্যান, কে আইনজীবী নেতা তাদের দিকে তাকিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাউকে জামিন দেওয়ার সুযোগ নাই আপনার। বিচার আসনে বসে এভাবে বিচার বিভাগের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করবেন না। আপনি এ ধরনের কাজ করতে থাকলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা তো কাজ করতে পারবে না। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে জুডিশিয়ারিকে ভয় পেয়ে চলতে হবে। হাইকোর্ট বলে, দুর্নীতি-অরাজকতা কোথাও বাসা বাঁধলে সেখানে কোনো ব্যবস্থাপনা থাকে না। এটা সবাই জানে।

এ পর্যায়ে জেলা জজের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। এরপরই হাইকোর্ট আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য দিন ধার্য রেখেছেন। এ সময় রিভিশনকারী পক্ষে ব্যারিস্টার এ বি এম আলতাফ হোসেন, অ্যাডভোকেট এসএম আমজাদুল হক ও তাহসিন মোক্তার নিশান উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত স্থলপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ রাস্তায় শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে ভয়ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টির অপরাধে গত ৫ এপ্রিল কক্সবাজারের রামু থানায় মামলা করেন দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোদেস্তা বেগম রীনা। ১৩ এপ্রিল এই মামলায় চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলার নয় আসামি আগাম জামিন চাইলে ছয় সপ্তাহের মধ্যে আসামিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত ২১ মে ঐ নয় আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে তাদেরকে হাজতিমূলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন। 

ম্যাজিস্ট্রেট আদেশে বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত আসামি ইউনূছ, নুরুল আবছার ও সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার অতীত রেকর্ড রয়েছে। এই পর্যায়ে অভিযুক্তগণ জামিন পেলে বিচারকাজ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় আসামিদের জামিনের আবেদন না-মঞ্জুর করা হলো। হাজতিমূলে জেলহাজতে প্রেরণ করা হোক। ঐদিনই আসামিরা জামিন চাইলে দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল আসামিদের জামিন দেন। এরপর তাকে তলব করে হাইকোর্ট।

ইত্তেফাক/এমএএম