জামিন আদেশ নিজেই টেম্পারিং করেছেন দায়রা জজ!

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ০১:৫৯

ম্যাজিস্ট্রেটের নামঞ্জুরের দিনই এক মামলায় চার্জশিটভুক্ত ৯ আসামিকে জামিন দেন কক্সবাজারের দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল। তলব আদেশে সেই মামলার মূল নথি নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন হাইকোর্টে। 

মূল নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান যে, আদেশের অংশে ঘষামাজা (টেম্পারিং) করেছেন ঐ দায়রা জজ। ঘষামাজা করে জামিন আদেশ থেকে ‘হাজতবাস’ শব্দটি বাদ দেন তিনি। এই হাজতবাসের গ্রাউন্ডে এক মামলার ৯ আসামিকে তিনি জামিন দিয়েছিলেন। অথচ মামলা দায়েরের পর থেকে এক দিনের জন্যও কারাগারে গিয়ে হাজতবাস করেননি আসামিরা। নিজ আদেশে এমন টেম্পারিংয়ের বিষয়ে হাইকোর্টের জিজ্ঞাসার জবাবে কোনো সদুত্তরও দিতে পারেননি নিম্ন আদালতের ঐ বিচারক। তখন হাইকোর্ট বলেন, আপনি এক জন সিনিয়র জেলা জজ। দীর্ঘদিন বিচারকাজ করেছেন। আপনি নিজের আদেশ টেম্পারিং করেছেন। এতে আপনার বুক কাঁপল না? এতে প্রমাণিত হয় আপনি ভুল নয়, জেনে-বুঝে ক্রাইম (অপরাধ) করেছেন। একটি অন্যায় ঢাকতে গিয়ে আরেকটি অন্যায় করেছেন। বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এই মন্তব্য করেন।

হাইকোর্টের এমন মন্তব্যের জবাবে ঐ দায়রা জজ বলেন, জামিন আদেশে দুটি শব্দ ভুলে সংযোজন হয়েছে। এর জন্য ক্ষমা চাই। হাইকোর্ট বলেন, আদেশে কিছু পরিবর্তন করতে হলে সব পক্ষকে শুনে তা করতে হয়। কিন্তু আপনি তো সে ধরনের কোনো প্রসিডিউর অনুসরণ করেননি। আপনি জেনে-বুঝেই এটা করেছেন। এটা তো ভুল নয়, অপরাধ। আদেশ টেম্পারিং করেছেন, অথচ আপনার মধ্যে তো কোনো অনুশোচনা দেখতে পাচ্ছি না। অনুশোচনা মন থেকে আসতে হয়। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে সেটা দেখতে পাচ্ছি না। আদালতের জিজ্ঞাসার এক পর্যায়ে ঐ দায়রা জজ বলেন, ‘আমার শরীরটা ভালো নেই।’ তখন হাইকোর্ট তাকে বসার অনুমতি দেন। এরপর মাথা নিচু করে তিনি বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকেন।

এর আগে দায়রা জজের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আদালতে আবেদন দেন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি চান। এই আইনজীবী বলেন, ‘আমরা এই মামলা কনটেস্ট করতে চাই না। আমরা অনুতপ্ত।’ হাইকোর্ট বলে, আপনারা অনুতপ্ত। অথচ জেলা জজের মধ্যে অনুতপ্তের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাচ্ছি না।  পরে সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২৭ জুলাই এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য দিন ধার্য রাখেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার ও রিভিশনকারী পক্ষে ব্যারিস্টার এ বি এম আলতাফ হোসেন শুনানি করেন।

প্রসঙ্গত স্থলপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ রাস্তায় শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে ভয়ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টির অপরাধে গত ৫ এপ্রিল কক্সবাজারের রামু থানায় মামলা করেন দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খোদেস্তা বেগম রীনা। ১৩ এপ্রিল এই মামলায় চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলার ৯ আসামি আগাম জামিন চাইলে ছয় সপ্তাহের মধ্যে আসামিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত ২১ মে ঐ ৯ আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে তাদেরকে হাজতিমূলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন। 

ম্যাজিস্ট্রেট আদেশে বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত আসামি ইউনূছ, নুরুল আবছার ও সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার অতীত রেকর্ড রয়েছে। এই পর্যায়ে অভিযুক্তরা জামিন পেলে বিচারকাজ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় আসামিদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হলো। হাজতিমূলে জেলহাজতে প্রেরণ করা হোক। ঐ দিনই আসামিরা কারাগারে না গিয়ে জামিন চাইলে দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল জামিন দেন। 

জামিন আদেশে বলেন, আসামিদের হাজতবাস ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে জামিন মঞ্জুর করা হলো। কিন্তু এই ৯ আসামি মামলা দায়েরের পর থেকে এক দিনের জন্যও কারাগারে গিয়ে হাজতবাস করেননি। তবে হাইকোর্টের তলব আদেশের পর ঐ জেলা জজ জামিন আদেশ থেকে হাজতবাসের শব্দটি ঘষামাজা করে বাদ দেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি