প্রকৃতিকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। প্রকৃতি যদি কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সে দমে থাকে না। এর বিরূপ প্রভাব সময়ে স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। তা কম অথবা বেশি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে গোটা পৃথিবী আক্রান্ত।
ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে রেকর্ড বন্যা হচ্ছে। এ কারণে জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। উজানের বানের পানিতে বাংলাদেশের অনেক নদনদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চলে অকালবন্যা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভাটি অঞ্চলে নির্মাণ করা হয়েছে ‘অল ওয়েদার’ সড়ক। এ নিয়ে উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনার শেষ নেই। শোনা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কোনো রকম সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গত বছর ভাটিতে বন্যার সময় ঢালুতে পানি নামতে সমস্যা হচ্ছিল মূলত এই সড়কের কারণে। স্থানীয় লোকজন কয়েক বছরের মধ্যে উন্নয়নের নেতিবাচক প্রভাব উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। এই সড়কের কারণে ভাটির হাওরের একাংশের জমিতে পলি পরতে শুরু করেছে, এতে ফসল উৎপাদন কমছে। উঁচু হয়ে যাচ্ছে অনেক জমি।
এমনিতেই নানা কারণে ভাটির হাওরগুলোতে এখন আর বছর জুড়ে পানি থাকে না। খননের অভাবে নাব্য হারিয়েছে নদনদীগুলো। খাল ও নদী থেকে শুরু করে জলাশয় ভরাট, দখলের থাবা চলছেই। বদলে যাচ্ছে অনেক নদীর গতিপথও।
এর মধ্যে ‘অল ওয়েরদার’ সড়ক নির্মাণের পর প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিরূপ প্রভাব সরকারের কানেও গেছে। সম্প্রতি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে বলতে শুনেছি, হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন আর কোনো প্রকল্প হবে না। সেখানে উড়াল সড়ক হবে।
২০০৯ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলে আসছেন, কৃষিজমি ও মিঠাপানি ভরাট ও নষ্ট না করা। অর্থাৎ প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি খাদ্যোত্পাদন থেকে শুরু করে মিঠা পানির মাছ রক্ষার পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। করোনা পরিস্থিতি আর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যসংকটের শঙ্কা থেকে পতিত সব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার বারবার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের কারণে উন্নয়ন জরুরি। তা আটকানো যাবে না। কিন্তু উন্নয়ন মানেই হলো পরিকল্পিত ব্যবস্থা। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে উন্নয়ন করা মানেই এর খেসারত দিতে হবে। তাই উন্নয়নের নামে এমন কিছু নষ্ট বা ক্ষতি করা উচিত নয়, যার বিপরীত কোনো প্রভাব পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর কৃষিজমি আর জলাশয় ভরাট না করার বার্তা কি মাঠ পর্যায়ে কেউ শোনে? প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নামেই প্রকল্প স্থাপন হয়েছে—এমন নজিরও আছে। নেত্রকোনায় ‘শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়’র নামে প্রায় ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এটি একটি বড় বিল। সাত মাসের বেশি হাজারো মানুষ বিল থেকে মিঠা পানির মাছ খেতে পারত। বিলের জলের শাপলা-শালুক থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক নানা সম্পদ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত অনেকেই। সেই সঙ্গে ধান উত্পাদিত হতো পুরো মাঠ জুড়ে। তদারকি ছাড়া এক প্রকল্পের কারণে ধান, মাছ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য সবই গেল। যখন খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে তখন উর্বর ৫০০ একর জমি রাতারাতি বালু ফেলে ভরাট হয়েছে। এটা সরাসরি প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। যার নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
এটাই কি শেষ? সারা দেশে এমন অসংখ্য প্রকল্প করা হয়েছে, যা হয়তো নীতিনির্ধারকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রকৃতি আর স্থানীয় মানুষের। প্রকল্প হবে, কিন্তু কোনো নজরদারি ছাড়াই এটা সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না। যদি সত্যিকারের নজরদারি থাকত, তাহলে একে একে এতবড় সর্বনাশ হতো না। উদ্যোক্তারা এককভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে হয়ত তাকিয়েছেন। অন্যদিকে নজর দেওয়ার সময় ও সুযোগ ছিল না। কিন্তু তারাও তো সচেতন মানুষ। শিক্ষিত। ভালোমন্দ বোঝার কথা। কারো মধ্যে কি সর্বনাশের যন্ত্রণা হূদ্যন্ত্রে একবারের জন্যও উপলব্ধি হয়নি? এ কথা ভাবতেও অবাক লাগে।
সবশেষে হাওর এলাকার বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ এবং অধিকৃত জমিতে জলবায়ুসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। অর্থাত্ হাওরবাসী আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে।
গত ১৭ জুলাই ইউজিসিতে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা প্রকল্প প্রস্তাবনার ওপর অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। সভায় ইউজিসির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর এই আহ্বান জানান।
তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘পরিবেশ ধ্বংস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প করা যাবে না। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে হাওর ও উপকূলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওর এলাকায় জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও প্রকৃতির গতিপ্রকৃতিকে সব সময় মাথায় রাখতে হবে। জমি অধিগ্রহণ করতে হবে আর্থসামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে। এছাড়া জলাধার ভরাট না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’
প্রশ্ন হলো, এই প্রকল্প নির্মাণে ইউজিসির আহ্বান কতটুকু কার্যকর হবে? এ নিয়ে প্রশ্ন থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এটা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী যদি খবর পেতেন তাহলে জলাশয় আর ধানের জমি ভরাটের পাশাপাশি মাছ আর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে তার নামে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে কোনো অবস্থাতেই সম্মত হতেন না। এমনকি এমন সর্বনাশ করা কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়নে তিনি মত দিতেন না। যা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো সমাধান আর হাতে নেই।
তাই শেষ কথা হলো, এ ধরনের প্রকল্প নির্মাণে কেন্দ্র থেকে তদারকি দরকার। প্রকল্পের জায়গা চূড়ান্ত হওয়ার পর উচ্চ পর্যায়ে (প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়) পরিদর্শন শেষে অনুমতি সাপেক্ষে নির্মাণকাজ শুরু হলে প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকবে। সবচেয়ে ভালো হয়, পরিবেশ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প না করা। কয়েক স্তরের নজরদারির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেও এর মধ্য দিয়ে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব। এতে কৃষিজমি ও মিঠা পানির মাছ আর জলাশয় নষ্ট হবে না। দেশে খাদ্যখাটতি নিয়ে দুশ্চিন্তা কম হবে। প্রকৃতির প্রতিশোধও কমবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
