কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতা ও কুষ্টিয়া-৪ আসনের সরকারদলীয় এমপি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ পরস্পরের বিরুদ্ধে চরম বিষোদগার করছেন। নেতারা তাদের বক্তৃতায় হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। এ নিয়ে জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গ্রুপিং চরম আকার ধারণ করেছে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দলের ইমেজে। দুই পক্ষ আয়োজিত পৃথক জনসমাবেশে নেতারা প্রতিপক্ষকে তুলোধুনা করার হুমকি দেন।
জানা যায়, গত উপজেলা নির্বাচনে খোকসা উপজেলায় আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী বাবুল আখতারের নির্বাচনি কাজে বিরুদ্ধাচরণের অভিযোগ উঠে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ সদর উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে কুষ্টিয়া-৪ আসনের (কুমারখালী-খোকসা) এমপি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির টানাপড়েন শুরু হয়। পরবর্তীকালে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জেলার শীর্ষ নেতাদের ডিঙিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রাক্তন এমপি গোলাম কিবরিয়ার নাতি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ দলীয় মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ঐ নির্বাচনে দলের সিনিয়র নেতা সদর উদ্দিন খান, সাবেক এমপি আব্দুর রউফ, আব্দুল মান্নান খান ও জাহিদ হোসেন জাফর এমপি প্রার্থিতার জন্য জোর তদবির চালিয়েও ব্যর্থ হন। এর পর থেকে তারা এমপি জর্জের দিক থেকে অনেকটা মুখ ঘুরিয়ে রাখেন। ফলে কুষ্টিয়া-৪ আসনে এমপি জর্জ, সাবেক এমপি আব্দুর রউফ, সদর উদ্দিন খান ও জাহিদ হোসেন জাফর ও আব্দুল মান্নান খান অনেকটা নিজ নিজ বলয়ে পরিচালনা করেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে অতি সম্প্রতি এমপি জর্জ বাদে বাকি নেতারা শান্তি সমাবেশে এক হয়েছেন। আর এতেই বাধে বিপত্তি, ঘটে ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ ও দলীয় সিনিয়র ঐ নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে গ্রুপিং স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত ১৭ জুলাই খোকসা উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত শান্তি সমাবেশে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন— জেলা আওয়ামী সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সিনিয়র নেতা জাহিদ হোসেন জাফর, কুমারখালী উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান, খোকসা উপজেলা চেয়ারম্যান বাবুল আখতার প্রমুখ।
এ সময় দলীয় নেতাকর্মীসহ জনসম্মুখে ঐ সিনিয়র নেতারা এমপি জর্জকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি নৌকার এমপি হওয়া সত্ত্বেও চলাফেরা করেন বিএনপি-জামায়াতের লোকজনের সঙ্গে। থানায় বসে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেন আপনি। আগামী নির্বাচনে এমপি জর্জকে বাদ নিয়ে যোগ্য ও ত্যাগীদের মনোনয়ন দেওয়ার দাবি তোলেন ঐ নেতারা।
এ ছাড়া ২১ জুলাই কুমারখালীর যদুবয়রা স্কুল মাঠের অপর সমাবেশে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে এমপি সেলিম আলতাফ জর্জের উদ্দেশ্যে বলেন, বেশি অহংকার ভালো না। মুরব্বিদের সম্মান করে চলতে শিখতে হবে। রাতের আঁধারে আমরাই তোমাকে এমপি বানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, এমপি হওয়ার পর তোমার এখন নিচের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগ করি, জনগণের দল করি। আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বাদ দিয়ে সভা করার ক্ষমতা তোমাকে কে দিয়েছে—এমন প্রশ্নও উত্থাপন করেন তিনি। এতে এমপি সেলিম আলতাফ জর্জও ক্ষুব্ধ হন চরমভাবে।
গত ২০ জুলাই খোকসা উপজেলায় অপর সমাবেশে এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ দলীয় ঐ নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বলেন, অনেক আজেবাজে কথা বলা হয়েছে। আমি আপনাদের বিরুদ্ধে বলতে চাই না। তবে সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির উদ্দেশ্যে বলেন, মিস্টার সদর খান, আপনি আমাকে রগে রগে চিনেন। কোন নেতা কখন আমার হাত-পা ধরেছেন তার রেকর্ড আছে। রাজনীতি করতে হলে শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় রাজনীতির মাঠ থেকে হারিয়ে যাবেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগার আলী বলেন, এমপি সেলিম আলতাফ জর্জের সঙ্গে আমাদের কোনো ঝামেলা নাই। এমপি এক শান্তি সমাবেশে দলীয় চার সিনিয়র নেতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। সে জন্য তার উদ্দেশ্যে বলেছি, এমপি হয়েছেন এই অহংকারটা করবেন না। রাতের অন্ধকারে এমপি বানিয়েছি—এ বক্তব্য অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদেরকে রাতের অন্ধকারে মানুষের কাছে যেতে হয়েছে, এ কথা তিনি বলেছেন বলে দাবি করেন।
এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান পদ ব্যবহার করে দলের ভেতরে অনৈক্য সৃষ্টির যে অপতত্পরতা করছেন, সেখানেই তার সঙ্গে আমার মতপার্থক্য। তিনি থানার নেতাদের না জানিয়ে শান্তি সমাবেশের নামে বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। জনসম্মুখে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি পালটা প্রতিবাদ করেছেন বলে জানান। তিনি আরও বলেন, আগামী ২৪ জুলাই যদুবয়রা ইউনিয়নে বিশাল সমাবেশ করে এসব অপপ্রচারের জবাব দেওয়া হবে।
