দশক দুই আগের কথা। একবার এক রোগীর হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সংক্রমণ চিকিত্সা করতে গিয়ে তীব্র সমালোচিত হলাম। তখনকার গাইডলাইন অনুসারে আমি সঠিক ছিলাম না। তবে আমি জেনেশুনে-বুঝে ভুলটা করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে থিসিস করতে এসে দেখলাম বেশ কিছু উপসর্গবিহীন হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের রোগী, যারা বায়োপসি করার আগ পর্যন্ত চিকিত্সা শুরু করার ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ করে না। তবে অণুবীক্ষণে পাওয়া যায় ফাইব্রোসিসের আলামত। শত্রুসীমান্তে জড়ো হয়েছে, দৃশ্যত কোনো ক্ষতির আলামত নেই অর্থাত্ ডিএনএ বেশি, এসবিইএজি পজিটিভ-ভাইরাস প্রতিলিপি তৈরি করছে। কিন্তু তার এসজিপিটি স্বাভাবিক। তার মানে হলো শরীরের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা সহনশীল আচরণ (আগে মনে করা হতো) করছে। যুদ্ধ না হলে শুরুতে ক্ষতির আলামত (এসজিপিটি বেশি নয়) থাকবে না। যকৃতের কোষগুলো ভাইরাস-আক্রান্ত নয় মনে করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেগুলোকে সাইটোকাইনের মাধ্যমে মেরে ফেলছে না।
হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস খুবই দুষ্ট ও চালাক, শরীরের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে এই পর্যায়ে ভাইরাস সবচাইতে বেশি প্রতিলিপি তৈরি করে এবং এই পর্যায়ে রোগী অন্যকে বেশি সংক্রমিত করে। আন্তর্জাতিক জার্নাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে ২০০৮ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত লিভার-বিজ্ঞানী সেরিনের লেখায় দেখা গেছে, এমন উপসর্গবিহীন রোগীদের সবচাইতে বেশি ভাইরাল লোড থাকা সত্ত্বেও যকৃত কোষে ক্ষতিগ্রস্ত (এসজিপিটি কম) হওয়ার আলামত নেই কিন্তু তাদের মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ রোগীর যকৃতের বায়োপসি টিস্যুতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ফাইব্রোসিসের আলামত আছে। অর্থাত্ ভাইরাসের বদকৌশলের কাছে শরীরের প্রতিরক্ষা-ইমিউন দুর্বল। মারামারি হয় না—কেউ কেউ শুধু মার খায়। এ জন্য এমন সব রোগীকে আগে বায়োপসি করা ছাড়া চিকিত্সা না দিলেও এখন (সারা বিশ্বের লিভার-পণ্ডিতরা ২০১৮ সাল থেকে) ৩০ বছরের বেশি বয়সিদের চিকিত্সা শুরু করতে বলা হয়েছে এবং হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের এই পর্যায়কে নতুন নামকরণ করেছেন, তা হলো—এসবিইএজি পজিটিভ ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ইনফেকশন।
‘গ্যারান্টিসহ যারা এসবিএসএজি নেগেটিভ করে দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেয়, এটা কীভাবে করে? পুরোটাই প্রতারণা নাকি ভুয়া রিপোর্ট দেয়।’ এই উত্তর হলো—আমরা বিজ্ঞানের বাইরে যেতে পারি না। প্রাপ্তবয়স্কের হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সংক্রমণ হলে সেটা স্বল্প সময়ের জন্য তীব্রভাবে উপস্থাপিত হয় এবং শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীর নির্দিষ্ট ওষুধ ছাড়াই এসবিএসএজি নেগেটিভ হয়—শরীরের প্রবল ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে। তবে ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস পুনরায় সক্রিয় হয়ে তীব্রভাবে উপস্থাপিত হতে পারে, যারা আর সাধারণত নেগেটিভ হয় না। ক্রনিক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সম্পূর্ণ নিরাময় কখনোই হয় না (সিসিসি ডিএনএ এবং ভাইরাল ডিএনএ স্থায়ীভাবে সংহত হওয়ার কারণে)। খুব কম রোগীর কার্যকরী নিরাময় হয় (পেগ ইন্টারফেরনে শতকরা ৮ ভাগ এবং ওরাল অ্যান্টিভাইরালে শতকরা ৩ ভাগ পাঁচ বছরে—এসবিএসএজি নেগেটিভ হয়)। বর্তমানের ওষুধগুলো নিয়ন্ত্রক টি সেল সিডি ৪ কমিয়ে সিডি ৮-এর ইমিউন কার্যকারিতা বাড়িয়ে ডিএনএ-এর বৃদ্ধি দমন করার চেষ্টা করে।
হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসকে এখন আর বাহক বলে না। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস অকর্মণ্য বাহক বলে কিছু নেই। তার মানে হলো—এসবিএসএজি টেস্ট পজিটিভ, এসজিপিটি স্বাভাবিক, এসবিইএজি নেগেটিভ, ডিএনএ ২০০০ আই ইউ-এর কম এবং অ্যান্টিএসবিই পজিটিভ হলেই আগে বলত ‘অকর্মণ্য বাহক-ভয় নাই’। কিন্তু গবেষণার দেখা গেছে কিছু কিছু রোগীর (এমনকি শতকরা ৪০ ভাগ পর্যন্ত) এই অবস্থায় ও অল্প আকারে যকৃতে ফাইব্রোসিস এবং যকৃতে প্রদাহ হচ্ছে। তার মানে এই অতি চালাক ভাইরাসটা দৃশ্যত যকৃতে আঘাতের চিহ্ন রাখে না অর্থাত্ এসজিপিটি স্বাভাবিক এবং প্রায়ই স্বাভাবিক থাকে কিন্তু তলে তলে টেম্পো চালায়। মাঝে মাঝেই পরীক্ষা করে দেখতে হবে—প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসের আলামত পাওয়া গেলে অ্যন্টিভাইরাল লাগবে। মন্দের ভালো হলো এই পর্যায়ে কোয়ান্টিটেটিভ এসবিএসএজি কম থাকে এবং সিরোসিস বা যকৃত ক্যানসার হওয়ার হার কম। এখানে কোয়ান্টিটেটিভ এসবিএসএজি বলেছি—সাধারণত মানুষ এসবিএসএজি এলাইজা টাইটার পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে এসে জানতে চায়, কমল না বাড়ল—যেটা সঠিক নয়।
আগামী ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের কার্যকরী টিকা আছে। টেস্ট নেগেটিভ থাকলে অবশ্যই টিকা দিতে হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় জন্মের পর সব শিশু টিকা পাচ্ছে। কিন্তু টিকা পাওয়ার আগেই অনেক বাচ্চা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায়ই হয় সংক্রমিত। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে শিশুবয়সে এবং মাতৃগর্ভে—সেটা নিজের মায়ের মাধ্যমে সংক্রমণ। খারাপ ব্যাপারটা হলো—শিশু বয়সের সংক্রমণ শতকরা ৯৫ ভাগ ক্রনিক হয়ে যায়—দুর্বল ইমিউন প্রতিক্রিয়ার জন্য, যারা অজান্তে অন্যদের সংক্রমিত করে এবং এদের মধ্যে শতকরা পাঁচ ভাগ শিশু দূর ভবিষ্যতে যকৃতের ক্যানসারসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল যকৃতের রোগে ভোগে। এই শিশুরাই একদিন মা-বাবা হবেন এবং সংক্রমিত করবেন নিজ সন্তানকে।
এজন্য বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের এই বছরের স্লোগান হলো—‘আমরা অপেক্ষা করছি না’। অপেক্ষা না করে সবাই টেস্ট করুন—এসবিএসএজি এবং অ্যান্টিএইচবিসি টোটাল। বাংলাদেশে ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। এদের মধ্যে ২৮ লাখ নারী (১৮ লাখ প্রজননক্ষম, ৪ লাখ শিশু) । নেগেটিভ থাকলে টিকা দিন। টেস্টটি পজিটিভ থাকলে চিকিত্সার আওতায় আসুন। চিকিত্সায় থাকলে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস আক্রান্ত মা-বাবার বাচ্চাও অসংক্রমিত থাকবে।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
