নাইজার যাহা বলিতে চাহে

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৩, ০৮:১০

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়াছে। নাইজারের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বাজুমকে বুধবার সকাল হইতেই প্রেসিডেন্ট গার্ডের সেনারা আটকাইয়া রাখিয়াছে। জানা গিয়াছে, নাইজারের আটক প্রেসিডেন্টের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাইয়াছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। পশ্চিম আফ্রিকায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেই লড়াই চলিতেছে সেই লড়াইয়ের মূল চালিকাশক্তি পশ্চিমা বিশ্ব। আর প্রেসিডেন্ট বাজুম ছিলেন পশ্চিমাদের অন্যতম সহযোগী। তিনি ২০২১ সালে গণতান্ত্রিকভাবেই নির্বাচিত হইয়াছিলেন। ইতিপূর্বে নাইজার সরকার দুইটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সহিত লড়াই করিতেছিল। ইহার একটি দক্ষিণ-পশ্চিমে, এই বিদ্রোহী দলটি ২০১৫ সালে মালি হইতে পলায়ন করিয়া নাইজারে অবস্থান লইয়াছিল। অন্যটি বিদ্রোহী দলটি দক্ষিণ-পূর্বে, উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়াতে অবস্থিত। কেবল নাইজার নহে, তাহার দুই প্রতিবেশী দেশ মালি ও বুরকিনা ফাসো সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হইয়াছে। দুই দেশেই নূতন সামরিক নেতারা বিবাদে জড়াইয়া পড়িয়াছে ফ্রান্সের সহিত। স্মর্তব্য যে, ফ্রান্স এই অঞ্চলের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি। ১৯৬০ সালে ফ্রান্স হইতে স্বাধীনতা লাভের পর হইতে নাইজার চারটি অভ্যুত্থানের সম্মুখীন হইয়াছে। আর অভ্যুত্থানের চেষ্টা হইয়াছে অসংখ্যবার।

ষাট-সত্তর-আশির দশকে যেই সকল দেশ স্বাধীনতা লাভ করিয়াছিল, আমরা দেখিতে পাই সেই সকল দেশে একধরনের ‘আনফিনিশড রেভ্যুলেশন’ অবস্থা বিরাজ করিতেছে। নাইজারও ইহার বাহিরে নহে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথিতযশা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক বেনেডিক্ট রিচার্ড ও গর্ডন অ্যান্ডারসন তাহার ‘ইমাজিনড কমিউনিটিস’ গ্রন্থে বলিয়াছেন, নূতন রাষ্ট্র গঠনের পর সেই রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ‘ইতিহাসের এক নূতন যুগ’, ‘সূর্যোদয়’ প্রভৃতি উপমা ব্যবহার করিয়া থাকে। স্বাধীনতার সময় সদ্যস্বাধীন দেশের অধিবাসীরা একধরনের ঘোরের মধ্যে থাকেন, তাহারা একধরনের স্বাপ্নিক আকাঙ্ক্ষার ফানুসে ভাসেন; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাস্তবতা হইল, তাহারা স্বাধীনতার পরও অস্থিতিশীল ভূখণ্ডেরই বাসিন্দা থাকিয়া যান। ইহা বুঝিতে আমাদের এই পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক গঠনশৈলীর দিকে দৃষ্টিপাত করিতে হইবে। আদি পৃথিবীর ভূগঠনের সময় মাটির নিচের টেকটোনিক প্লেটের ঘনঘন সংঘর্ষ হইত। প্রতিটি সংঘর্ষে কাঁপিয়া উঠে সেই অংশের ভূখণ্ড। বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া এই রকম টেকটোনিক প্লেটের বারংবার সংঘর্ষের পর একসময় ধীরে ধীরে ভূখণ্ডগুলি স্থিতিশীল হইতে থাকে। জীবন্ত আগ্নেয়গিরির বৈশিষ্ট্যও একই রকম। জীবন্ত আগ্নেয়গিরি অধিকাংশ শান্ত-চুপচাপ থাকে; কিন্তু যে কোনো সময়, যখন-তখন উহার ভিতর দিয়া তপ্ত লাভার উদিগরণ ঘটিতে পারে।

এই বিশ্বের বহু স্থানেই ভূরাজনৈতিক অবস্থা ঐ আদি টেকটোনিক প্লেট আর আগ্নেয়গিরির মতো। তাহারা উপরে কথিত স্থিতিশীল; কিন্তু ভিতরে ভিতরে অস্থিতিশীল। এই অস্থিতিশীলতা হইল এই সকল রাষ্ট্রের আনফিনিশড রেভ্যুলেশন। এই অসমাপ্ত বিপ্লবের রেশ বহু বৎসর ধরিয়া চলিতে পারে। সুতরাং যেই বিপ্লব অসমাপ্ত, যেই ভূখণ্ডের টেকটোনিক প্লেটে ঝামেলা রহিয়াছে, সেইখানকার মাটি ঘন ঘন কাঁপিবেই। যেই আকাশে যেই কৃষ্ণমেঘ জমা রহিয়াছে, তাহা হইতে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি তো হইবেই। যতদিন না সেই মেঘের পুরাপুরি ক্ষয় হইতেছে, ততদিন বৃষ্টির দমক থামিবে না, ততদিন প্রকৃতিও থমথমে থাকিবে। সুতরাং অসমাপ্ত বিপ্লব যেইখানে ঘটিয়াছে, সেইখানে সহিংসতা, হানাহানি, বড় বড় হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান-পালটা অভ্যুত্থানসহ সকল কিছু মিলাইয়া একটি কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতা তৈরি হইয়া আসিতেছে বহু যুগ ধরিয়া। ইহার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনো বিশ্বের নানান রাষ্ট্রে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে।

মনে রাখিতে হইবে, এই সকল টেকটোনিক প্লেট হইল বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিরা। আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভাও ঐ পরাশক্তিরা। তাহারা একসময় নিজেদের উপনিবেশ ছাড়িয়া ঘুড়িকে আকাশে স্বাধীনভাবে উড়িবার অধিকার দিয়াছে বটে; কিন্তু লাটাই রাখিতে চাহিয়াছে নিজেদের হাতে। এই জন্য অসমাপ্ত বিপ্লবের এই ধরনের দেশ কার্যত বহু ক্ষেত্রে অসহায়। এই অবস্থা হইতে উত্তরণের জন্য এই সকল দেশে দরকার যথাযথ শিক্ষা, নিজেদের মধ্যে ঐক্য। ইহা সহজ নহে, কেননা ঐক্য যাহাতে তৈরি হইতে না পারে, তাহার জন্য অতি লোভনীয় প্ররোচনার শেষ নাই; কিন্তু নিজেদের বুঝ নিজেদেরই তো বুঝিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন