'বই' দুই বর্ণের একটি শব্দ মাত্র। যা এসেছে আরবি 'ওহি' থেকে। আরবি ওয়াও হরফের বাংলা উচ্চারণ হয় 'ব'। ওহির বাংলা উচ্চারণ হয় বহি। ধীরে ধীরে ভাষার পরিবর্তনে বহিটি বই রুপ ধারণ করেছে। এভাবে বইয়ের সঙ্গে ঐশী জ্ঞানের একটি সম্পর্ক রয়েছে।
জ্ঞান ও ভাবের রত্নভাণ্ডার বই, হৃদয় তৃষ্ণা ও ভাব সম্পদের মনীষার সাধন ক্ষেত্র বই। নিরক্ষরকে অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরিত করা, জাতীয় ঐতিহ্যকে, তার আত্মপরিচয়কে, সম্যকভাবে সার্বজনীন করার সহায়ক বই। সম্প্রতি বই পাঠের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা হয়েছে, সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বই পড়া দেশের মধ্যে প্রথম অবস্থানে আছে ভারত আর বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে ১০ নম্বর অবস্থানে সৌদি আরব। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, তালিকায় স্থান পাওয়া ২৯ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম নেই। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন যতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই মননের দিক থেকে যেন দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। বই পড়ার অভ্যাসের সূচক দিন দিন নিম্নগামী হওয়া একটি জাতির জন্য এক অশনি সংকেত।
বই বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎে, কাছে থেকে দূরে, প্রান্ত থেকে অন্তে, এমনকি যুগ থেকে যুগান্তরে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলো পৌঁছে দিতে পারে। দেশ কালের সীমানা অতিক্রম করে জ্ঞানের প্রভাকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো বই। শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো স্বশিক্ষা। আর স্বশিক্ষার শ্রেষ্ঠ সহায়ক হলো বই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে জ্ঞান চর্চা, বিনোদন থেকে অবসরযাপন, শৈশব থেকে বার্ধক্য, আমাদের যাপিত জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ও শ্রেষ্ঠ অবলম্বন হলো বই।
বই পড়লে পাঠকের মানসিক চাপ হ্রাস পায়। আধুনিক নাগরিক জীবনে মানসিক চাপ যেন আমাদের নিত্য সঙ্গী। মানসিক চাপ কমাতে নিরুপায় হয়ে আমরা কত কিছুই না করি, এমনকি চিকিৎসকের শরণাপন্ন পর্যন্ত হই। কিন্তু মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত বই পাঠ করে মানসিকভাবে সুস্থতা অর্জন করতে পারেন, বই পড়ার মজা হচ্ছে এটি একজন মানুষকে মুহূর্তের মধ্যেই কোন এক অজানা জগতে নিয়ে যায় কিংবা এমন কোন সময়ে ভ্রমণ করায় যা সে কল্পনাও করেনি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন, 'বই পড়াকে যথার্থ হিসাবে যে সঙ্গী করে নিতে পারে তার জীবনের দুঃখ কষ্টের বোঝা অনেক কমে যায়।' বই পড়লে মস্তিষ্কের ব্যায়াম হয়, Jonathan Swift বলেছেন, 'বই হচ্ছে মস্তিষ্কের সন্তান।' গবেষকরা বলেন বই পড়লে মস্তিষ্কের জটিল কোষগুলো উদ্দীপিত হয় ও স্নায়ুগুলো উজ্জীবিত হতে থাকে। পড়ার সময় পাঠকের মস্তিষ্ক ভিন্ন জগতে বিচরণ করে ও পঠিতব্য বিষয়ের প্রতি সে মনোনিবেশ করতে পারে। এভাবে মস্তিষ্কের নানাবিধ ও বহুমাত্রিক বিচরণের কারণে পাঠকের মানসিক চর্চা বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় প্রমাণিত, বই অধ্যয়ন ডিমনেসিয়া ও অ্যালঝেইমার রোগ প্রতিরোধে দারুণ কার্যকরী ভূমিকা রাখে, এজন্য প্রায় ৩০০ বছর পূর্বেই Joseph Addison বলেছেন, 'Reading is to the mind, what exercise is to the body' অর্থাৎ, 'শরীরের জন্য যেমন ব্যায়াম, মনের জন্য তেমন বই পড়া।'
Short and Long Term Effects of a Novel on Connectivity in the Brain নামের গবেষণায় MRI করে দেখা যায় উপন্যাস পড়ার সময় মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ২০১৩ সালে এ গবেষণায় দেখা যায় বই পড়ার পুরো সময় জুড়ে ও তারপরের দিনগুলোতেও মস্তিষ্কের সংযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞ মস্তিষ্কের সোমাটো সেন্সরি করটেক্স অংশ যা নাড়াচাড়ায় ও ব্যথার মতো শারীরিক সংবেদনগুলিতে নাড়া দেয়। কিফ ল্যান্ড ক্লিনিকের চিকিৎসকেরা মনে করেন শিশু ও পিতা-মাতার একসঙ্গে বই পড়া উচিত।
বই পড়ার সঙ্গে ব্রেইনের সম্পর্ক কি?
অভিজ্ঞতার সম্পর্ক। এরকম মাঝেমধ্যে অনেককেই বলতে শোনা যায়, একটি বই তার জীবন বদলে দিয়েছে। এটা কেন হয়? এটা হয় কারণ ওই বই পড়ার সময় তার নিউরনে নিউরনে নানা নতুন সংযোগ তৈরি হয়েছে আরও আরও সংযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ও এইগুলো এত বেশি পরিমাণে যে তিনি চিন্তার নতুন দুনিয়া দেখতে পেয়েছেন, তার জীবন দৃষ্টি বদলে গেছে। মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তার মস্তিষ্ক বদলে যায়। অভিজ্ঞতা অর্জন বা নিউরন তৈরি বা নতুন সংযোগ তৈরির মাধ্যমে মস্তিষ্ককে পরিবর্তন করতে পারে। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন মাত্র এক দিনের ব্যবধানে মস্তিষ্ক পরিবর্তিত হতে পারে। আইডেন্টিক্যাল টুইন, যাদের আইডেন্টিক্যাল জিন আছে এদের মস্তিষ্ক আলাদা হয়, কারণ তাদের অভিজ্ঞতা আলাদা। দুজন মানুষের বেড়ে ওঠা, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা, শারীরিক গঠন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি একই রকম হয় না। এগুলো তাদের আচার, ব্যবহার মতাদর্শ ও চরিত্রের নানা ভিন্নতা তৈরি করে। সাধারণত মতাদর্শের ক্ষেত্রে লোকে মনে করে কোন মতাদর্শ সে বেছে নিয়েছে, কারণ ওইটা সেরা এজন্য। কিন্তু এই বেছে নেওয়ার পিছনে তার বেড়ে ওঠা, সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদির ভূমিকা প্রচুর। অনেকেই খেয়াল রাখে না, অভিজ্ঞতা তৈরি করে আমাদের। আমরা একেকজন আলাদা হয়ে উঠি আমাদের অভিজ্ঞতার ভিন্নতার জন্য। এই অভিজ্ঞতা অর্জন ও মস্তিষ্ককে আরো বেশি চিন্তা উপযোগী করার এক সেরা মাধ্যম হলো বই পড়া।
একজন লোক যে ধরনের বই পড়েন তার মস্তিষ্কের কানেকশনগুলি সেই রকম হয়। সেই অনুপাতে তার বোঝার ক্ষমতা গড়ে ওঠে যারা পপুলার ফিকশন পড়ে কেবল প্রায়ই দেখা যায় তারা অন্য ভালো বই পড়তে পারেন না।
অনুভূতি ও বিশ্বাস করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বই
সেন্সিং পেইন রিসার্চ এ দেখা গেছে যে, যারা কথাসাহিত্য পাঠ করেন তারা অন্যদের অনুভূতি ও বিশ্বাস বোঝার ক্ষমতা রাখেন। গবেষণা এই ক্ষমতাটিকে একটি মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব বলে থাকে, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় দক্ষতা। যদিও অল্প কিছু কথা সাহিত্য পাঠ অনুভূতির জন্ম দিতে পারে না, গবেষণার বিশ্বস্ত উৎস দেখায় যে, দীর্ঘ মেয়াদী কথাসাহিত্য পাঠ, পাঠকদের প্রভূত মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নকে সুনিশ্চিত করে।
হতাশা ও দুশ্চিন্তা কমাতে বই
২০০৯ সালে USA বিজ্ঞানীরা Stress level এর উপর যোগব্যায়াম ও বই পড়ার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। তারা আবিষ্কার করেন আধাঘণ্টা বই পড়া যোগ ব্যায়ামের মতই আমাদের রক্তচাপ,উচ্চ হৃদয় স্পন্দন ও মানসিক অস্থিরতা কমায়। UK National Health Service 'Reading Well' নামে একটি প্রেসক্রিপশন প্রোগ্রাম শুরু করেছে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে কিছু শর্তের জন্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সহায়ক বইগুলো লিখে দেন।
প্রাণী হিসেবে মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতির কারণ অন্যের কাছ থেকে শেখা
মানুষ একটি কালচারাল প্রাণী। কালচারাল বলতে মানুষ জন্ম নেওয়া থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত অনেক কিছু শেখে, বিশেষত অন্য মানুষের কাছ থেকে, এগুলির মাধ্যমেই সে টিকে থাকে।
আধুনিক মানুষের যে কালচারাল জিনিস শেখা আছে তা বনে বাসের উপযুক্ত নয়, তাই তাদের ওই জায়গায় টিকে থাকতে হলে প্রাচীন পিগমি দলের প্রয়োজন। যাদের কাছ থেকে তারা শিখে নিতে পারবে ওই জায়গার কালচার। অন্য প্রাণীর চাইতে এখানে মানুষের পার্থক্য। অন্যের কাছ থেকে শেখায় মানুষকে স্মার্ট ও অধিকতর সফল করে গড়ে তুলেছে। অনেক অনেক বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যন্ত্রপাতি তৈরি করতে, আগুন জ্বালাতে, শিকার করতে পরস্পরের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল ও গড়ে তুলেছিল এক সামগ্রিক কালচার। অন্যের কাছ থেকে শেখা এক জেনারেশনের অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে পরের জেনারেশন এর এগিয়ে যাওয়া, এভাবেই এগিয়েছে মানবজাতি। আমাদের আলাদা ব্যক্তিত্ব শুধু বুদ্ধিমত্তার জন্য নয়, আমাদের সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা ও তা থেকে নেওয়ার ক্ষমতাই মানুষ হিসাবে আমাদের সফলতার নেপথ্যের মূলমন্ত্র। মানুষের বহু যুগের অর্জিত জ্ঞান ও চিন্তার সার থাকে একেকটি ভালো বইয়ে, তা সেনেকায় আছে, মার্কাস ঔরেলিয়াসে আছে , শেক্সপিয়ারে আছে, আছে হেগেলে, রুমিতে, রবীন্দ্রনাথে বা নজরুলে।
আমাদের কালচারাল বিবর্তন বা উন্নতি হয়েছে সম্মানিত বা শ্রদ্ধেয় লোকদের কাছ থেকে শেখার মাধ্যমেই। ভালো বইয়ের মাধ্যমে, ভালো বই পড়ে আমরা বড় মানুষের চিন্তা থেকে নিতে পারি, নিজেকে উন্নত করতে পারি, জীবন ও জগত সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি আরো সমৃদ্ধ করতে পারি।
উদ্যোক্তাদের জন্য বই পড়া কেন অপরিহার্য
উদ্যোক্তা হতে হলে সবার আগে প্রয়োজন উদ্ভাবনী চিন্তা আর সৃজনশীলতা। বই পড়ার অভ্যাস একজনকে এই দুটো গুন রপ্ত করতে সাহায্য করবে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী বিল গেটস ভীষণ বই এর পোকা। নিয়মিত বই পড়েন এবং তার ব্লগেও (www.gatesnotes.com) প্রিয় বইগুলো নিয়ে লেখেন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ নিয়ম করে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে বই শেষ করেন। তিনি বলেছেন, 'Books allow you to fully explore a topic and immerse yourself in a deeper way than most media today.'
ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচশত পৃষ্ঠা করে পড়েন। বই পড়ার বিষয়ে তার মতামত হল, 'Read 500 pages every day. That’s how Knowledge works. It builds up, like compund interest. All of you can do it, but I guarantee not many of you will do it.'
আর ইলন মাস্ক তো বই পড়েই রীতিমতো রকেট বিজ্ঞান রপ্ত করে ফেলেছেন।
রাজনীতিবিদদের বই পড়ার আবশ্যকতা
রাজনীতিবিদরা দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেন ও আমলারা তাদের এই সুকঠিন কাজে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতিবিদ ও আমলাদের সিদ্ধান্তেই একটি দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই তাদের নিয়মিত বই পড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিবিদদের প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা প্রার্থনার মতো নিবিষ্টচিত্তে বই অধ্যয়ন করা উচিত এবং আমলাদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিদিন কমপক্ষে অফিসে এক ঘণ্টা বই পাঠ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সকল সরকারি দপ্তরে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবী। তথ্য প্রযুক্তির যুগে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের আরো ডিজিটালি, স্মার্টলি শিক্ষিত হতে হবে। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কল্যাণে প্রতিটি দপ্তরে বাধ্যতামূলক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও আরো প্রতিষ্ঠার কাজ অব্যাহত রয়েছে। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ প্রতিটি নাগরিককে এখন থেকেই সার্বিক জ্ঞান অর্জন সহ সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল নিয়মিত বই পড়তেন ও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সফলতার চাবিকাঠি কি? তিনি উত্তরে বলেছিলেন প্রতিদিন ৫শ পৃষ্ঠা বই পড়। ফ্রাঙ্কলিন ডি- রুজভেল্ট ১৯৪৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন, মৃত্যুর সময় তার সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা ছিল ২১০০০, তিনি কলেজে পড়া কালীন সময় থেকেই বই সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন। তিনি অসামান্য দ্রুতগতিতে বই পড়তে পারতেন, সকালে নাস্তার আগেই একটি বই পড়ে শেষ করতেন তিনি। তিনি ৩৫টি বই ও ১,৫০,০০০চিঠি লিখেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুও বই পড়তেন ও লিখতে ভালবাসতেন, কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বই ছিল তার আশার প্রদীপ।
অনতিবিলম্বে বই পড়াকে আমাদের একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপান্তর করতে হবে। এজন্য বাস স্টপেজ, বাস স্টেশন, রেল স্টেশন, বিমানবন্দর সহ বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনকি শপিংমল, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ সকল বিপণী বিতানে বাধ্যতামূলকভাবে কমপক্ষে একটি করে বই বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। শুভেচ্ছা ও উপহার হিসেবে বই প্রদান বৃদ্ধি করতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে প্রার্থনার মত করে প্রতিদিন আবশ্যিকভাবে বইপাঠ করতে হবে।
চিত্ত প্রসারণে ও বুদ্ধির বিকাশ সাধনে বই পড়ার উপকারিতার কথা বলাই বাহুল্য। বই কেবল নির্মল আনন্দের খোরাক যোগায় না। মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে বুদ্ধির বিকাশ ঘটাতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আনাতোল ফ্রাঁস বই পড়ার আনন্দে অভিভূত হয়ে বলেছিলেন, 'নানা জ্ঞান বিজ্ঞান যতই আমি আয়ত্ত করতে থাকি, ততই একটা একটা করে আমার মনের চোখ ফুটতে থাকে।'
বই পড়লে আমাদের মনের দিগন্ত উন্মোচিত ও প্রসারিত হয়। আমাদের মনে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূর করে দেয় বই। প্রকৃত মানুষ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো যথার্থ জ্ঞানী হওয়া, আর প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী হতে হলে চিত্তের প্রসারণ ও বুদ্ধির বিকাশ উভয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বই মানুষের চিত্ত ও বুদ্ধির বিকাশের জন্য যথেষ্ট। বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির মতে 'আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে তার জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী'। তাই আমাদের চিত্তের প্রসারণ ও বুদ্ধির স্বাধীনতার জন্য বই পাঠ জরুরি।
দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন, 'সংসারে জ্বালা- যন্ত্রণা এড়ানোর প্রধান উপায় হচ্ছে নিজের ভেতর আপন ভুবন তৈরি করে নেওয়া ও বিপদকালে তার ভেতরে ডুব দেওয়া, যে যত বেশি ভুবন তৈরি করতে পারে ভব যন্ত্রণা এড়ানোর ক্ষমতা তার তত বেশি হয়।'
যেহেতু বই পড়ার মাধ্যমে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির ও মননশীলতার বিকাশ হয় সেহেতু বই হতে পারে আমাদের জীবনের একনিষ্ঠ বন্ধু। বই কিনে ও বই পড়ে আমাদের জীবনের গতিপথ বদলাতে পারি এবং উঠতে পারি উন্নতির চরম শিখরে, এজন্য প্রয়োজন আমাদের সন্তানদের বই কিনে দিয়ে তাদের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত সভ্যতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া।
সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায়, 'বই কিনে কেউ কোনদিন দেউলিয়া হয় না।' ভলতেয়ার বলেছেন, 'সে দেশ কখনো নিজেকে সভ্য দেশ হিসেবে দাবী করতে পারবে না যতক্ষণ না তার বেশিরভাগ অর্থ চুইংগাম এর পরিবর্তে বই কেনার জন্য ব্যয় হবে।'
ওমর খৈয়ামের বিখ্যাত উক্তিটি বইয়ের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট, তিনি বলেছেন, 'রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু একখানা বই অনন্তযৌবনা, যদি তেমন বই হয়।' সুতরাং বই হোক উত্তম বন্ধু এবং বইয়ের সঙ্গে অটুট থাক আমাদের মিতালী।
বেশিরভাগ মানুষ এখন আর আগের মতো বই পড়তে চান না। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে অস্থির মানুষের মন ও মনন। ফেসবুক, ইউটিউবে নতুন নতুন তথ্য আমাদের অনেক সময় বই পড়তে নিরুৎসাহিত করে।
এই ডিজিটাল যুগে আবার পাঠকদের অনেকেই প্রিন্ট করা বইয়ের পিছনে টাকা পয়সা খরচ করতে চায় না। বইয়ের অনলাইন সংস্করণ পড়ে। কিন্তু একটি বই হাতে নিয়ে পড়া ও সংগ্রহে রাখার আনন্দই যে আলাদা। মুদ্রিত একটি বই হাতে ধরে পাঠ করার সময় বইটির সঙ্গে পাঠকের এক অভূতপূর্ব মিথস্ক্রিয়া হয়, যা শুধুমাত্র পাঠকের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নই সাধন করে না, একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অসামান্য কল্যাণকর ভূমিকা পালন করে।
পরিশেষে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করব, জাতিসংঘের অধিবেশনে দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, 'একটি বই, একটি কলম, একটি শিশু ও একজন শিক্ষক পুরো পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।'
লেখক
ড. আব্দুল ওয়াদুদ, ফিকামলি তত্ত্বের জনক প্রেসিডিয়াম সদস্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, প্রধান পৃষ্ঠপোষক, বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতি।

