প্রতি মাসে শুধু রাজধানীতেই নিখোঁজের জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হচ্ছে ৪৯৮টি। এত নিখোঁজ মানুষ যায় কোথায়, কত জনই বা ফিরে আসে—এমন কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে। এই নিখোঁজের তালিকায় শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সি মানুষই আছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীতে নিখোঁজসংক্রান্ত জিডি হয়েছে ৫ হাজার ৯৮৪টি। অর্থাত্, প্রতি মাসে গড়ে ৪৯৮টি নিখোঁজের জিডি হয়েছে। প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনায় একটি করে জিডি হয়েছে। অর্থাত্, গেল বছর শুধু রাজধানী থেকেই নিখোঁজ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার মানুষ। এর মধ্যে কত জন ফিরে এসেছে, সেই তথ্য নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নানা কারণে মানুষ নিখোঁজ হয়। অনেক তরুণ আবার স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ছে। অনেকে জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কাউকে কাউকে তুলে নেওয়ার অভিযোগও আছে। অনেকে ফিরে আসে। আবার অনেকের লাশ পাওয়া যায় বেওয়ারিশ হিসেবে। কিন্তু এসবের কোনো তথ্যই কারো কাছে নেই।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তির ফিরে আসার পরিসংখ্যান করা বেশ কঠিন। কারণ কম বয়সি ছেলেমেয়ে যারা প্রেম করে চলে যায়, পরিবার জিডি করে। কিন্তু পরে যখন ফিরে আসে, সব স্বাভাবিক হয়, তখন থানায় তা আর জানায় না। অভিমান করে বা নানা কারণে বাড়ি থেকে অনেকে চলে যায়, পরে ফিরে এলে তা জানায় না। এছাড়া রাজধানীতে গৃহকর্মী, গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মীরা না জানিয়ে চলে গেলে থানায় জিডি হয়। এরপর তারা চলে এলে বা খোঁজ পাওয়া গেলেও অনেকেই সে বিষয়ে পুলিশকে জানায় না। ফলে নিখোঁজ এবং তাদের ফিরে আসার বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান করা সম্ভব হয় না।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কিছু তরুণ আবার হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ে। তাদের অধিকাংশকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আবার অনেক নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে বাড়িতেও পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ।
রাজধানীর কদমতলী থানার মুরাদপুর এলাকায় বসবাস করতেন মো. মাসুদ মোল্লা (৩৫)। পেশায় রাজমিস্ত্রি মাসুদ গত ১৭ মে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। স্ত্রী নাদিয়া বেগম বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মাসুদের কোনো সন্ধান পাননি। নিখোঁজের দুই দিন পর নাদিয়া কদমতলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ১২২১) করেন। প্রায় দুই মাস পার হতে চললেও এখনো মাসুদের কোনো খোঁজ পায়নি পুলিশ।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি ২৫ বছর বয়সি মাজহারুল ইসলাম। ঘটনার পরদিন মাজহারুলের বাবা মো. আলমগীর মোহাম্মদপুর থানায় একটি জিডি করেন। একইভাবে গত বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর শনির আখড়ার বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি মো. নজরুল ইসলাম। ঘটনার সাড়ে তিন মাস পর যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করে তার পরিবার।
গত ১০ জুন রাজধানীর মুগদা থানার দক্ষিণ মাণ্ডা এলাকায় বাসা থেকে চা খাওয়ার কথা বলে বের হন ৬১ বছর বয়সি কে এম আব্দুল কাইয়ুম। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান না পেয়ে অবশেষে মুগদা থানায় জিডি করেন নিখোঁজের স্ত্রী জুড়িয়ানারা বেগম। ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তার খোঁজ মেলেনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে নিখোঁজ জিডির পরিসংখ্যান থাকলেও ঠিক কতজন নিখোঁজ ব্যক্তি ফিরে এসেছেন, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য নেই। এর কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে, নানা কারণে নিখোঁজের জিডি হয়। পরিবার থেকে নিখোঁজের জিডি করলেও অনেকে ফিরে আসার পর তারা পুলিশকে জানায় না। ফলে ঠিক কত জন নিখোঁজ ব্যক্তি ফিরে আসছে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া পুলিশের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না।
নিখোঁজদের অনেকেই ফিরে এলেও সবাই যে ফিরেছে, তা নয়। দিন, মাস, বছর পার হয়ে গেলেও অনেকের খোঁজ এখনো মেলেনি। স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা এসব পরিবার ভুগছে মানসিক অশান্তিতে। কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছে, কেউ ছোট্ট শিশুকে। কেউ হারিয়েছে কৈশোর পেরোনো তরুণ কিংবা তরুণী, যাদের ছিল অনেক স্বপ্ন। প্রিয়জনকে হারিয়ে স্বজনদের দিন কাটছে উদ্বেগ, আশঙ্কায়।
২০১৭ সালের ২৬ আগস্ট নিখোঁজ হন কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহম্মেদ। ছুটিতে দেশে ফিরে ধানমন্ডির স্টার কাবাব রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাতে বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন ইশরাক। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় জিডি করেন তার বাবা মো. জামাল উদ্দীন। প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ছেলেকে এখনো ফিরে পাননি তিনি।
তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে নিখোঁজ ও গুমের অভিযোগ পাওয়া গেছে ১১৯টি। এসব অভিযোগের মধ্যে ১০৮টি নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। অভিযোগগুলোর মধ্যে নিখোঁজ ২৮ জন ফিরে এসেছে, ৩৪ জন বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়েছে। বাকি ৫৭ জন এখনো নিখোঁজ। তবে নিখোঁজের অধিকাংশ ঘটনারই কোনো অভিযোগ পায় না মানবাধিকার কমিশন।
২০২১ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০২১ সালে সারা দেশে ১৬২টি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সংস্থাটিতে অভিযোগ এসেছে মাত্র ৮টি। ২০২২ সালে সারা দেশে ১৫৮টি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে সংস্থাটিতে অভিযোগ এসেছে হাতে গোনা কয়েকটি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিখোঁজের এমন পরিস্থিতি আইনের শাসনের একটি দুর্বলতা। একটা মানুষ উধাও হয়ে গেল, কীভাবে হলো, কেন হলো, তার কোনো গুরুত্ব নেই। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।
