অপরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার রাশ টানিতে হইবে

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৩, ০৮:০৫

দেশ জুড়িয়া ২৫১টি সেতু নির্মাণের প্রজেক্ট ১৩ বৎসরেও শেষ হয় নাই। বরং, প্রাথমিকভাবে ৬২৮ কোটি টাকার প্রজেক্টের খরচ ৩৬৪ শতাংশ বাড়িয়া ২ হাজার ২৮৮ কোটিতে ঠেকিয়াছে। ১৩ বত্সরে সেতু নির্মিত হইয়াছে সর্বমোট ৭৭টি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ‘বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন’ বিভাগের জমা করা একটি প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে যে, ৭৭টি সেতুর মধ্যে ২২টিতেই ইতিমধ্যে ভাঙন দেখা গিয়াছে।

সেতু নির্মাণের প্রাক্কালে সেতুর পার্শ্ববর্তী মাটির যথাযথ নিরীক্ষণের অভাব, মাটি প্রয়োজনমাফিক সন্নিবেশন না করা, সংযোগ সড়কের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জায়গা সংরক্ষণ না করা এবং সংযোগ সড়ক তৈরির পর তাহা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করাসহ আরো নানাবিধ অবহেলার ফলে সেতুগুলির সংযোগ সড়ক হয় সঠিকভাবে নির্মাণ করা হইয়া উঠে নাই অথবা নির্মাণ হইলেও তাহা ব্যবহারের উপযোগ্য হইবার আগেই ভাঙিয়া পড়িয়াছে। আবার কিছু সেতুর সংযোগ সড়কে দেখা দিয়াছে ধস। নদীমাতৃক ও কৃষিনির্ভর এই বাংলার জনমানুষের জীবনে সেতুর প্রয়োজনীয়তা নিঃসন্দেহে অপরিসীম। গ্রীষ্মে খাল-বিল, নদী-নালা শুকাইয়া গেলেও ভরা বর্ষায় সেতুর অভাবে বাঁশের তৈরি সাঁকোতে জীবনের ঝুঁকি লইয়া এই খাল-বিল পাড়ি দেয় বেশির ভাগ গ্রামাঞ্চলের মানুষ। একটি জনপদ গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠে উহার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হইবার মাধ্যমে। আর আমাদের নদীমাতৃক দেশে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতিসাধনে সবচাইতে বড় প্রতিবন্ধক হইল প্রয়োজনীয় সেতুর অভাব। গ্রামীণ জনপদে একটি সেতু এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, উহা সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা আমূল পালটাইয়া দেয়। সুতরাং সেতু তৈরির পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা আমাদের গ্রামীণ জনপদের সামগ্রিক জীবনমানের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

একটি সেতুর নির্মাণ-প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বেই নিয়মমাফিকভাবে সেই সেতুর কার্যকারিতা, তাহার সংযোগ সড়ক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয়, সংযোগ সড়কের ঢালের জন্য মাটির উচ্চতা-বৃদ্ধি ও সর্বোপরি সেতুর ব্যবহারযোগ্যতার মতো কিছু বিষয় বিবেচনা করা হইয়া থাকে। এই সকল বিষয়াদি পাশ কাটাইয়া বরাদ্দ টাকা লইয়া নামকাওয়াস্তে একটি সেতু বানাইয়া দিলেই তাহা ব্যবহারোপযোগী হইয়া যায় না। কিন্তু, বহু ক্ষেত্রে এই অনিয়মের অজস্র দৃষ্টান্ত আমরা বত্সরের পর বত্সর দেখিতে পাইতেছি। যেমন ধরা যাউক, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের বৈরাতি খালের উপর কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও ত্রাণ অধিদপ্তরের নির্মিত দুইটি সেতুর কথা। বরাদ্দ কম থাকায় খালের দৈর্ঘ্যের তুলনায় আপেক্ষিকভাবে ছোট দৈর্ঘ্যের সেতুটি কোনো রকম দায়সারাভাবে তৈরি করিয়া ফেলিয়া রাখা হইয়াছিল। করা হয় নাই যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও। ফলে বন্যায় সেতুগুলির সংযোগ সড়ক ধসিয়া গিয়াছে। এখন দুই-দুইটি সেতু থাকা সত্ত্বেও আশপাশের চারটি গ্রামের সহস্রাধিক স্থানীয়দের প্রতিদিন বাঁশের সাঁকো পার হইয়া পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ উপজেলা ও অন্যান্য গন্তব্যস্থলে যাইতে হইতেছে। অথচ এই দুইটি সেতু নির্মাণে খরচ হইয়াছে দেড় কোটি টাকা! অপরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার মাশুল তবে কম নহে। কিন্তু এই টাকা তো জনগণেরই করের টাকা। সেই কারণেই কি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণে এত অনীহা?

একইরকম পরিস্থিতি ও অব্যবস্থাপনার নজির দেশের আরো বহু জায়গায়, বিশেষত উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের এলাকাগুলিতে পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়, নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রিকা সড়কে ১৯৯৮ সালে নির্মিত এক সেতু গত ২৫ বৎসরে একবারও ব্যবহার হয় নাই। হইবে কী করিয়া? সেতুতে উঠিবার জন্য সংযোগ সড়কই তৈরি হয় নাই এত বৎসরে! একইভাবে, সিলেটের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বদলপুরে সংযোগ সড়কের অভাবে প্রায় পাঁচ বত্সর আগে নির্মিত একটি সেতু প্রায় অকার্যকর অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। সেতুতে উঠিবার জন্য সংযোগ সড়ক যদি তৈরিই না হয়, বা ৯০ ডিগ্রি খাড়া মাটি বাহিয়া সেতুতে উঠিতে হয়, তবে সেই সেতু মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো বই কমায় না। এই বিষয়ে যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের আরো দায়িত্বশীল হইতে হইবে। ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’—এই মানসিকতা হইতে তাহাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন