মোহন বাগানের সোনার ফ্রেমে বাংলাদেশের সাত জন

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৩, ০৯:২৪

মোহন বাগান ক্লাবে উচ্চ শব্দে মিউজিক বাজছে, সেই শব্দ শোনা যায় ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের গেটে দাঁড়িয়ে। মোহন বাগানে উৎসব, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে ক্লাব টেন্টে বিশাল আয়োজন। উৎসবে অভিনন্দন জানাতে কে না এসেছেন। বাগানের উৎসবের এই দিনে গুণীজনদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেটা ফুটবলে হোক কিংবা অন্য ক্ষেত্রে। তবে বাগানের ফুটবলে সবুজ-মেরুন জার্সিতে যারা অবদান রেখেছেন তারা সংবর্ধনা পান আগে। টেন্ট আলোকসজ্জা করা হয়। লোকের ভিড় সামাল দিতে পুলিশকে ডেকে আনা হয়। 

এই দিনে সবার গায়ে সবুজ-মেরুন গেঞ্জি, মোহন বাগানের কর্মকর্তাদের স্ত্রী সন্তানরা আসেন, মন্ত্রী এমপিরা আসেন। সাংবাদিকদের ভিড় জমে, পতাকা উত্তোলন, অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করা, উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া, দিনব্যাপী অনুষ্ঠান চলতে থাকে। এর মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শুভেচ্ছা জানিয়ে যান। চলতে থাকে গান-বাজনা, খাওয়াদাওয়া। সবই হয় ঐতিহাসিক ২৯ জুলাই। এটি মোহন বাগান দিবস। 

এই দিবস পালন করার কারণ হচ্ছে  ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই, আইএফএ শিল্ডের ফুটবল ফাইনালে মোহন বাগান ২-১ গোলে ব্রিটিশ দল ইষ্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ব্রিটিশদের শাসন আমলে এটি ছিল অনেক বড় একটি ঘটনা। এটি শুধু নিছক একটি ফুটবল ফাইনাল নয়। পুরো পৃথিবী জুড়ে জানাজানি হয়ে গেল ব্রিটিশরা হেরে গেছে তাদেরই শাসনে থাকা একটি দলের বিপক্ষে। বিষয়টা এমন এক পর্যায়ে গেল-এ যেন মুখ দেখানোর কায়দা নেই। এসব কথা মোহন বাগানে ক্লাবে আসা অতিথিদের মুখে মুখে।

মোহন বাগান খেলল ১১ জন ফুটবলার নিয়ে। গোলকিপার যিনি ছিলেন তার চোট ছিল। খেলার মতো সুস্থতা ছিল না। তারপরও তাকে নামতে হয়েছিল। কারণ দলের খেলোয়াড়ই হচ্ছেন সব মিলিয়ে ১১ জন। তারা সবাই খালি পায়ে খেলেছেন, আর ব্রিটিশরা বুট পায়ে খেলেন।

মোহন বাগানের ঘরে সেই ১১ জনের একটি ছবি আছে। ১১২ বছর আগের সেই ছবি। ১১ জন ফুটবলার খালি পায়ে, চ্যাম্পিয়ন হওয়া সেই শিল্ড। সাদাকালো যুগে সোনার ফ্রেমে বাঁধানো সেই ছবিটি পরম যত্নে মোহন বাগানের কাচের ঘরে সম্মানের সঙ্গে তুলে রাখা হয়েছে। 

কাচের ঘরের সামনে দাঁড়ানো ২২ বছরের তরুণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য এমএসসি পাশ করা শুভ্রনীল সাহা, মোহন বাগানের সোনায় মোড়ানো গৌরবে কথাগুলো গড়গড় করে বলছিলেন। যেন ইতিহাসবিদ। 

শুভ্রনীলের কণ্ঠে, ‘১৯১১ সালের ফাইনাল ম্যাচটা দেখতে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর লোকে এসেছিল। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর থেকে লোকে এসেছিল। জয়টা ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালির মধ্যে জাতীয়তাবাদ জাগাতে সাহায্য করেছিল। ঐ বছরই রাজধানী কলকাতাকে স্থানান্তর করা হয় দিল্লিতে। আমরা এসব তথ্য জেনেছি বই পড়ে। ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা থেকে। এই জয়ের ওপর সিনেমা তৈরি হয় ‘এগার’ নামে। মুক্তি হয় ২০১১ সালে।’ 

মোহন বাগান শত বছর ধরে যে জয়টি বুকে আগলে গর্ব করে আসছে সেই ১১ জন ফুটবলারের মধ্যে বাংলাদেশের সাত জন। সেই সাফল্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার। লেফটব্যাক রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জীর জন্ম ফরিদপুরে, রাইট আউটের যতীন্দ্রনাথ রায় কানুর জন্ম ময়মনসিংহে, সেন্টারহাফ পজিশনের রাজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের জন্ম বরিশালে, রাইট ইন পজিশনের শিরিশ চন্দ্র সরকার হাবুলের জন্ম ঢাকায়, সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড পজিশনের অভিলাষ ঘোষের জন্ম ময়মনসিংহের পণ্ডিতপাড়ার, লেফট আউট পজিশনের বিজয় দাস ভাদুড়ি, জন্ম বরিশালে, এই দলটির অধিনায়ক ছিলেন রাইট আউট পজিশনের ফুটবলার শিব দাস ভাদুড়ি। তার জন্ম বরিশালে। বিজয় দাস এবং শিব দাস দুজনই ভাই। তারা নাকি দেখতেও একই চেহারার।

সেই ফাইনালে ব্রিটিশ দলটি ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল। আর মোহন বাগানের গোল দুটিও করেছিলেন বাংলাদেশেরই দুই সন্তান শিব দাস এবং অভিলাষ। প্রথম গোলটি করে সমতা আনেন শিব দাস, আবার দ্বিতীয় গোলটি অভিলাষ করলেও শিব দাসই গোল বানিয়ে দিয়েছিলেন অভিলাষকে, বিভিন্ন তথ্য ঘেটে জানা যায়। এই ১১ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ২৫ বছর বয়সের ফুটবলার ছিলেন বিজয় দাস ভাদুড়ি। খেলা শুরুই করেছিলেন ফরিদপুরে। দুই ভাই বিজয় দাস ভাদুড়ি এবং শিব দাস ভাদুড়ি সম্পর্কে উপমহাদেশের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক কলকাতার রূপক সাহা জানালেন এই দুই ভাই দেখতে একই রকম হওয়ায় প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ দলের ডিফেন্ডারদের চোখ খুব সহজেই ফাঁকি দিয়ে গোল মুখে ঢুকে যেতেন।’  

রূপক সাহা বললেন, ‘তখন পার্ক স্ট্রিটে সাহেবদের এলাকায় কেউ যেতে পারত না। পুলিশ তাড়িয়ে দিত। ১৯১১ সালের ঐ একটি হার ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা নাড়িয়ে দিয়েছিল। ওরা টের পেয়ে গিয়েছিল কলকাতায় আর থাকা হবে না। ওরা এখান থেকে রাজধানীটাকে নিয়ে গেল দিল্লিতে।’

ঐতিহাসিক সেই ঘটনা নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক রূপক সাহার লেখা বিখ্যাত বই ‘একাদশের সূর্যোদয়’ এ উল্লেখ আছে ‘মোহন বাগানের শিল্ড জয় দুটো কারনে উল্লেখযোগ্য। এক, পরাধীন ভারতীয়দের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে ছিল, ফুটবল মাঠে ইংরেজদের যদি হারানো যায় তাহলে দেশ থেকেও দূর করা সম্ভব হবে। তার পর থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। এই জয় হিন্দু, মুসলমানকে খুব কাছাকাছি এনে দিয়েছিল। সেটা আন্দাজ করে ইংরেজরা গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নেয়। ছয় মাসের মধ্যে তারা কলকাতা থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লিতে।’

তথ্যমতে রায়বাহাদুর অক্ষর রায়ের তৃতীয় সন্তান যতীন্দ্রনাথ রায় কানু শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন ঢাকায়। খেলা শুরু করেছিলেন ঢাকার ওয়ারী ক্লাবে। পরে মোহন বাগানে গিয়ে ফুটবলারের স্বীকৃতি পেলে তাকে নিয়ে লেখা ‘সোনার ফ্রেমে মোহন বাগান’ বইয়ে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে যতীন্দ্রনাথ রায় কানু ১৯২১ সালে আইএফএ শিল্ডে ঢাকার ফুটবল দল ওয়ারীর জার্সি গায়ে তার প্রিয় দল মোহন বাগানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলেছেন। মোহন বাগানের জালে গোল করে ফুটবলে ইতি টেনেছেন।

১১ জনের মধ্যে শেষ ব্যক্তি যিনি বেঁচে ছিলেন তিনি সুধীর চ্যাটার্জি। ১৯৬৪  সালে মোহন বাগান ক্লাবে প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীতে ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের জীবিত শেষ ব্যক্তি সুধীর চ্যাটার্জি বলেছিলেন,‘এই মুহূর্তে আমি আমার খেলার সঙ্গীদের শূন্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। আর ওরাও বোধ করি অন্য জগতে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’ 

সুধীর চ্যাটার্জির ৮০তম জন্মদিনে মোহন বাগান সম্পাদক ধীরেন দে সুধীরের বাসায় গেলে তিনি ধীরেন দে-কে বললেন, মন ভালো নেই। ভারত-চীন যুদ্ধ। তুমি এক কাজ করো আমার ১৯১১ সালের ফাইনালে পাওয়া স্বর্ণ পদকটা নিলাম করে ন্যাশনাল ডিফেন্স ফান্ডে দিয়ে দাও।’  ১২ এপ্রিল জন্ম নেওয়া মানুষটি ১৯৬৬ সালের ১২ এপ্রিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

ইত্তেফাক/এসএস