কলকাতার ফুটবলের গল্প বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকের জানা। খবরে পড়ে, ছবিতে দেখে এখনো অনেকের মানসপটে যে ছবিটা আঁকা রয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। কল্পনার জগত্টাকে সহজেই হার মানাবে যদি একবার ইস্ট বেঙ্গল-মোহন বাগান ডার্বি নিজের চোখে দেখা যায়। এই ম্যাট ম্যাচ কোনো ভাবেই উপমহাদেশের সঙ্গে এখন আর তুলনীয় নয়। ৪২০ হাইভোল্টেজ ম্যাচের সামনে ডুরান্ড কাপ টুর্নামেন্টের নামটাই যেন নিভু নিভু বালভ হয়ে গেল। ইস্ট বেঙ্গল-মোহন বাগান ডার্বি দেখতে আসা দর্শকের ভেতরে ফুটবল রোমাঞ্চ এমনভাবে আবেগে ভাসিয়ে তুলল—তা চর্মচক্ষুই প্রমাণ মিলল। পুরো কলকাতা, ফুটবলের আনন্দে ভেসে ওঠে। ব্রিটিশ আমলের টানা রিকশা থেকে শুরু করে বাস, ট্রাম, হলুদ ট্যাক্সি কিংবা ধনীর বাসা-বাড়ি, গাড়ি- সবখানেই ডার্বির উল্লাস। টুর্নামেন্টে কী পাবে সেই হিসাব কারো মুখে ছিল না। এখানে সমর্থকের মধ্যে উত্তেজনা। স্টেডিয়ামের বাইরে হাজার হাজার গাড়ি। ট্রাফিক হিমশিম খাচ্ছে। ৬৩ হাজার ৫০০ দর্শকের উপস্থিতি আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দর্শক সামাল দিতে আইন শৃঙ্খলার কড়া চোখ। ২ হাজার ৬০০ পুলিশ নামানো হয়েছিল শুধুমাত্র স্টেডিয়ামের বাইরে যানবাহন এবং দর্শক নিয়ন্ত্রণ করতে। ১৮ জন ডিসি এবং অ্যাডিশনাল ডিসি ছিলেন। সব জায়গায় আর্চওয়ে গেট। মোবাইল ফোন ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ছোট ছোট ট্রাক ভরে সমর্থক এসেছে। গাড়ি ভরে সমর্থকদের ছুটে আসা দেখে মনে হতো লিগ শিরোপা জয়ের আনন্দে ভাসছে। মোহন বাগান এবং ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক ভরা গাড়ি পাশাপাশি ট্র্যাফিক জ্যামে। এক গাড়ি হতে আরেক গাড়ির সমর্থককে শুদ্ধ উচ্চারণে যে ভাষায় গাল দেওয়া হলো এটা সহজেই মেনে নেওয়ার মতো না। যে কোনো ভদ্রলোক কানে তুলা দেবেন। কিন্তু তাদের ভেতরে পালটা ভাষা ছুড়ে দেওয়ার ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থকরা জয়বাংলা বলে আওয়াজ তুললেন। ওদের ব্যানারে লেখা বাঙালের লড়াই। আত্মমর্যাদার লড়াই। কথাটা এমনই।
ডুরান্ড কাপ ফুটবলে কাল ছিল ইস্ট বেঙ্গল-মোহন বাগানের গ্রুপ পর্বের লড়াই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে মৃত্যুকূপে পড়েছিল ইস্ট বেঙ্গল। আর অন্যদিকে মোহন বাগান ২ ম্যাচ জিতে ৬ পয়েন্ট নিয়ে দারুণ জায়গায় বসেছিল। তারপরও ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব সমর্থকদের উল্লাস পিলে চমকে দেবে। টানা আট ম্যাচ জয়ের দেখা পাচ্ছিল না মোহান বাগানের বিপক্ষে তার পরও ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থকদের কণ্ঠ গগনবিদারী। কলতাকার ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে টিপ্পনী কাটার মহোত্সব হয়। শৃঙ্খলা মেনে চলতে বলা হলে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ালেও পুলিশ রেগে যায় না। ধৈর্য্য নিয়ে পুলিশকে বলতে শোনা গেল—‘দেখ, চুড়ি পরে আসিনি। বাধ্য করিস না। খবর করে দেবো।’
সল্টলেকে আমরি হাসপাতালের উলটো দিকে স্টেডিয়ামের ৩ নম্বর গেট। হাজার হাজার লোকের ভিড়। রাস্তার চারপাশে যেভাবে পায়ে হাঁটারও পথ ছিল না। যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গন এই একটা ম্যাচ ঘিরে বার বার যৌবন ফিরে পায়। তারপরও প্রশ্নটা থেকে যায় ফুটবল উত্তেজনায় টইটুম্বর দেশটা কেন বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে উঠতে পারছে না। এমনকি এশিয়ার ফুটবলেও দাপট দেখাতে পারছে না। বাংলাদেশের ফুটবলেও মোহামেডান আবাহনীর ম্যাচ ঘিরে এমন ছবি দেখা গেছে। সেই স্বর্ণালি স্মৃতির কথা এখন আর ফিরে আসে না। অথচ বাংলাদেশে শত শত ফুটবল দর্শক আছেন যারা মোটা অঙ্কের টাকা খরচা করে ইউরোপে খেলা দেখতে যান। ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব এখন চোখের পলকে পেরিয়ে যায়। ফুটবলপ্রিয় এই মানুষগুলো একবার ইস্ট বেঙ্গল-মোহন বাগান ডার্বি উপভোগ করলে নতুন অভিজ্ঞতা হবে। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হবে। একবার স্বাদ নিলে আজীবন মনে থাকবে।
