চুল-দাড়ি মোটেই উশকোখুশকো নয়। চেহারাতে ছন্নছাড়া ভাব নেই। কথা বলতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন না। মোটকথা, তাকে ‘খ্যাপা বিজ্ঞানী’ বলা যাবে না। চোখেমুখে প্রতিভার দীপ্তি, তিনি হলেন রোনাল্ড ম্যালেট। বয়স ৭৮ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতক নিরলস গবেষণা, সাধনায় আজ তিনি ‘টাইম মেশিন’ তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন এবং এমন মেশিনের একটি প্রোটোটাইপও তিনি তৈরি করেছেন।
তার পিতা বয়েড ম্যালেট গত হয়েছেন আজ থেকে ৬৮ বছর পূর্বে, ১৯৫৫ সালে। রোনাল্ড তখন মাত্র ১০ বছর বয়সের নিতান্তই এক বালক। প্রিয় পিতার হাত ধরে সবে পৃথিবীর রূপ-রস ও সুরভির সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেছেন। জীবনের সুদীর্ঘ পথচলা তখনো অনেক বাকি। পিতার অকস্মাত্ মৃত্যুর পর, এতটা বছর পরেও এক দিনের জন্য তাকে ভুলে থাকতেও পারেন না রোনাল্ড।
আফ্রো-আমেরিকান তরুণ পিতা বয়েড ম্যালেট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সেনাবাহিনীর পাট চুকিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফিরে এসেছেন। তিন পুত্র ও এক কন্যাসন্তান নিয়ে বয়েড-ডরোথির সুখের সংসার। বয়েড টেলিভিশন মেরামতকারী হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় বাড়ির কাছে পাতাল রেল স্টেশনে পিতাকে এগিয়ে নিয়ে আসতেন ছোট্ট রোনাল্ড। ছোটবেলাতে রোনাল্ডের সবচেয়ে আনন্দের কাজ ছিল বাবাকে এগিয়ে আনা। বাবাও খুব খুশি হতেন। বাড়ি ফেরার এ পথটুকু আজও রোনাল্ডের স্মৃতিতে অম্লান।
মা-বাবা অর্থাত্ বয়েড-ডরোথির বিয়ের ১১তম বার্ষিকী। এই উপলক্ষ্যে বাড়িতে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। রাত হলে অভ্যাগত অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন। ক্লান্ত বয়েড-ডরোথি ঘুমিয়ে পড়লেন। দুঃস্বপ্ন দেখে খুব সকালে ডরোথি ঘুম থেকে উঠলেন। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্বামীকে খুঁজলেন। দেখলেন, বয়েডের মাথা বালিশ থেকে অনেকখানি দূরে। ভাবলেশহীন মুখে শ্বাস-প্রশ্বাসের কাঁপুনি নেই। আতঙ্কিত ডরোথি, খানিকটা ধাক্কা দিলেন বয়ডকে। বয়েডের নিথর নিষ্প্রাণ দেহ লুটিয়ে পড়ল। অস্ফুট, ভয়ার্ত কণ্ঠে চিত্কার করে কেঁদে উঠলেন ডরোথি। ছোট্ট রোনাল্ড আজও স্পষ্ট শুনতে পান মায়ের সেই বেদনার্ত ও বিষণ্ন কণ্ঠস্বর। হূদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়াতে বয়েড ম্যালেটের মৃত্যু হয়।
পিতার অকালমৃত্যু গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে রোলান্ডের মনে। কোনোভাবেই তিনি পিতার আকস্মিক মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছিলেন না এবং আজও তিনি মৃত্যুর মতো সত্যকে মেনে নিতে পারেননি। সেই শুরু। অতীতে ফিরে গিয়ে কীভাবে পিতার সান্নিধ্যে পাওয়া যায়, কীভাবে পিতাকে অসহায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যায়, সে উপায় বের করার ভাবনায় অস্থির হলেন। নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে অবিচল থেকে, নিজেকে তৈরি করতে শুরু করলেন।
ততদিনে প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতে বা অতীতে ভ্রমণের মজার সব কল্পকাহিনি দর্শকদের মনের ভাবনা-চিন্তার জগতে সীমাহীন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে শুরু করেছে। বাজারে ‘টাইম ট্রাভেল’ বিষয়ক বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বেশ কিছু বই পাঠক সমাদৃত হয়েছে। তিনি সেগুলো পড়ে ফেললেন। এরপর এক দিন হাতে পড়ল আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি বই।
মহাজগতে ‘সময়’ আজও এক গভীর রহস্য। আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটির মূল ধারণা অনুসারেই তিনি বিশ্বাস করেন যে, সময়-চতুর্থ মাত্রা। সময় পরম নয়, আপেক্ষিক এবং স্থান, গতিভেদে পরিবর্তন এরও হয়। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই তিন মাত্রার সঙ্গে আইনস্টাইন সময়কে জুড়ে চতুর্মাত্রিক জগতের ধারণা দেন। মাত্র ১১ বয়েসেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অতীতে ভ্রমণবিষয়ক ধারণাকে সমৃদ্ধ করতে হলে, এই বইটিই পারবে তাকে পথ দেখাতে।
আর সে পথে এগিয়ে যেতে হলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে দক্ষ হতে হবে রোনাল্ডকে। ঠিক করলেন, ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানী হবেন। পিতার মৃত্যুর পর, মায়ের সঙ্গে অন্য শহরে নতুন স্কুলে ভর্তি হলেন। সে স্কুলে মেধাবী ছাত্রদের তালিকায় শুধু শ্বেতাঙ্গদেরই দাপট। তিনি সহজেই ভালো ছাত্রদের টপকিয়ে তালিকার ওপরদিকে নিজের নাম উঠতে সক্ষম হলেন এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করলেন। বাবার কথা মনে পড়ল, তিনি বেঁচে থাকলে পুত্রের এমন সাফল্যে খুব গর্বিত হতেন। বাবা নেই, মাথার ওপর ছায়াটুকু নেই। চার সন্তান নিয়ে মা যেন সাঁতরে সাগর পাড়ি দিচ্ছেন। মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়, রোলান্ডের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা।
রোনাল্ড তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পথে না গিয়ে, হাজির হলেন বিমান সেনা নিয়োগ কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে যোগ দিলেন। বয়েসে তরুণ রোনাল্ড, কাজের বাইরে একটুও সময় নষ্ট করেন না। একা থাকতেই পছন্দ করতেন এবং সে সময়ে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব, সময়, স্থান-কাল, অভিকর্ষ বল, ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর পড়াশুনা করেন। একসময় হাতে পর্যাপ্ত অর্থ জমা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। ১৯৭৩ সালে পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এবং কর্মজীবন শুরু করেন।
বুদ্ধিদীপ্ত এবং প্রখর মেধাবী তরুণ গবেষক গবেষণায় চমকপ্রদ ফলাফল দেখাতে সক্ষম হলেও, বিজ্ঞান বোদ্ধাদের সামনে ‘অতীতে ভ্রমণ’ করার কথা তুলতে বা আলোচনা করতে কুণ্ঠিত হচ্ছিলেন। পাছে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন ভাবা হয়, এমন আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতে পারছিলেন না। তিনি যে সময়ে এমন ভাবনা ভাবছিলেন, আশির দশকে তখনো প্রযুক্তির বিস্ময় মুঠোফোন মানুষের মুঠো দখল করে বসেনি। ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ তখনো অনেকেই পর্দার আড়ালে।
পদার্থবিজ্ঞানের লব্ধজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অতীতে ফিরে গিয়ে প্রয়াত পিতার সঙ্গে দেখা করার বাসনা থেকে একবিন্দু সরে দাঁড়াননি রোনাল্ড। তিনি প্রায় অর্ধশতক এ নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছেন সময়ের আগে-পিছে ভ্রমণ করার একটি বাহন উদ্ভাবন করার জন্য। যে বাহনে করে তিনি ফিরে চান সেই ১৯৫৫-এর আগে, আরেকটি বার পিতার স্নেহের পরশে সিক্ত হতে।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কঠিন অধ্যবসায় তাকে আজ প্রায়ই পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের অনেক কাছাকাছি। কৃষ্ণ গহ্বর, ওয়ার্ম হোলের মধ্যে লুকিয়ে আছে সময়কে ঘুরিয়ে দেওয়ার আসল রহস্য। কৃষ্ণগহ্বরের অনুকরণে তীব্রগতিতে ঘূর্ণায়মান দীপ্তিময় লেজার রশ্মির সাহায্যে শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ বলয় সৃষ্টি করে সে রকমই পূর্ণাঙ্গ একটি টাইম ট্রাভেল মেশিন তৈরি করতে আজও দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
‘টাইম মেশিন’ ভাবনা আজ আর কষ্টকল্পনা নয় এবং রোনাল্ড ম্যালেট আজ সে সম্ভাবনার সদর দরজায় পৌঁছে গেছেন। তবে অর্থ অনর্থ বাঁধিয়েছে। ‘টাইম মেশিন’ বানাতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। ‘আজগুবি’ প্রকল্পে বিশাল অঙ্কের অর্থ জোগান দেওয়ার জন্য আগ্রহী কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। সাংবাদিকরা যখন এই মেশিনের সম্ভাবনা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন, তখন তিনি রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বিমান উড্ডয়নের উদাহরণ দিলেন। ১৯০৩ সালে তাদের বানানো বিমানে চতুর্থ বারের চেষ্টায় ৫৯ সেকেন্ডে মাত্র ২৬০ মিটার উড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। আর ঠিক তার ৬৬ বছরের মাথায় ১৯৬৯ সালে মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে।
ঠিক, যুগে যুগে এমনই হয়েছে। একসময় যা ছিল ‘আজগুবি’, তা-ই আজ বাস্তব। বিজ্ঞনীরা তা প্রমাণ করেছেন। রোনাল্ড ম্যালেট তার মৃত পিতার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও অনেকেই নিশ্চিত যে, তার দেখানো পথে মানুষ একদিন বর্তমান থেকে অতীতে বা ভবিষ্যতে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করবে। তখন অতীত-ভবিষ্যত্ বলে কিছু থাকবে না, স্থান-কাল আর সময় মানুষের মুঠোয় চলে আসবে।
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী
