১৯৭১: সেইসব দিন

দেশ-মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক অনবদ্য নির্মাণ

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৩, ১৮:৪২

‘১৯৭১: সেই সব দিন’ প্রখ্যাত মঞ্চকর্মী, অভিনেত্রী, নির্মাতা হৃদি হকের প্রথম চলচ্চিত্র। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকেই কাজ করেছেন, এমনটা বলা মুশকিল। কারণ অধিকাংশ নির্মাতাই প্রেম-ভালোবাসার বাণিজ্যিক ব্যাকরণে থেকেছেন। একাত্তরকে সেলুলয়েডে ধরা, এর পেছনের গবেষণা, পরিশ্রমের আলস্যও হয়তো কাজ করে। নয়তো এদেশে একাধিক সফল বাণিজ্যিক নির্মাতাকে যখন প্রশ্ন করেছি—দেশ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবে কাজ করবেন? সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেন না তারা। বলেন, করতে চাই, কিন্তু এসব ছবির দর্শক কৌতুহল কম, কিংবা প্রযোজকের অভাব ইত্যাদি নানা বাহানায় ব্র্যাকেটবন্দি থাকে সেই জবাবগুলো।

হৃদি হক তার এই প্রথম চলচ্চিত্রে খুব সাবলীলভাবে একটি ধারা বর্ণনায় দুটি লাইন বলেছেন। যা এ ছবি ও সাম্প্রতিক বোধের দুনিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলো ফেলে। তা হলো ‘আমরা নিরপেক্ষ থাকার আড়ালে কিছু বিষয় প্রশ্রয় দিই বা কিছু অনৈতিকতাকেও সমর্থন করি।’ হুবহু স্ক্রিপ্টটি মনে নেই। কিন্তু এর মমার্থ এ রকমই।

‘১৯৭১ সেইসব দিন’ চলচ্চিত্রের গল্পের প্লট মুক্তিযুদ্ধকালীন শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনগুলোর ক্রাইসিস। পরিশ্রমী কাজ করেছেন হৃদি হক। ৭১’ নিয়ে মূলত দুই ধরনের ছবি হয়। একটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি, আরেকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি। মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে তত্কালীন শহুরে মিডলক্লাস ক্রাইসিস নিয়ে এর আগে ছবি কেউ করেননি। সেই হিসেবে এটি ইউনিক একটি কাজ।

হৃদির ছবিটা মুক্তিযুদ্ধের। বড় আয়োজন, সেট, গোলাবারুদ, সেই সময়ের এক্সপ্লোশন সিকোয়েন্স কোনোকিছুরই কমতি রাখেননি নির্মাতা। বরং ১/২টি সিকোয়েন্সের জন্য গুণী গুণী অভিনয় শিল্পীদের জড়ো করেছেন। ছবির পুরোটা জুড়ে সমৃদ্ধ একটি ফ্রেম দেখানোর চেষ্টা করেছেন। ছবিটি দেখার পরে যে বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে বলতে ইচ্ছে করে, তা হলো ছবিটির শিল্প নির্দেশনা। অসাধারণ! কী নিখুঁত আর যত্নের ছাপ!

জানলাম, এই দারুণ কাজটি করেছেন অভিনেতা লিটু আনাম। নব্বই দশকের এই জনপ্রিয় অভিনেতাকে দীর্ঘদিন আমরা পাই না। লিটু আনাম এই ছবিতে তার চরিত্রে প্রথমে খল হিসেবে ঢুকে পরবর্তীতে যে দ্বিধাগ্রস্তটা দেখিয়েছেন তা একজন জাত অভিনেতা বলেই সম্ভব। অর্ষা ও আনিসুর রহমান মিলনের পর্দা উপস্থিতি সামান্য থাকলেও দু’জনই চমত্কার করে ছুঁয়ে গেছেন দর্শকমন তাদের অভিনয় দিয়ে!

কলকাতার দেবজ্যোতি মিশ্রের আবহ সংগীত ও গানের কম্পোজিশন বরাবরের মতো অনবদ্য। কিন্তু নির্মাতা মনে হয় সংগীত পরিচালকের প্রতি বাড়তি মুগ্ধতায় প্রায় পুরো ছবিতেই স্কোর রেখেছেন। কিছু কিছু জায়গায় নীরবতা বা কোনোরকম বিজিএমবিহীন কিছু সিকোয়েন্স কানের আরাম দিতো! তবে ছবির কালারগ্রাফিক্স অসামান্য!

ছবির গল্প এগিয়েছে একাত্তরের সন তারিখের বিবরণে। খুব চমত্কার বিন্যাস। আপনাকে ছবির প্রথমার্ধেই বসিয়ে রাখবে এই ড্রামা জনরার মুভিটা। ড্রামা জনরায় কাজ করা অনেকাংশেই কঠিন, কারণ এই ধারায় নান্দনিকতা আর উইট ছাড়া আপনি বাড়তি থ্রিল দিতে পারেন না। আবার যে প্রেক্ষাপটের গল্প বলছেন, সেখানে কমেডি বা হিউমার টুইস্টের সংযোজনও খুব ভেবে-চিন্তে করতে হয়। সেটিই করেছেন হৃদি।

ছবির গল্পে পাকিস্তানিদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনে একই পরিবারের বড় ছেলে লিটু আনাম দেশের স্বাধীনতাকে নিয়ে দ্বিধা ও আপত্তির কথা তোলে। অন্যদিকে সজল ও সাজু খাদেম পরস্পরের বন্ধু। অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রকৃত চরিত্রের খোলসটা বেরিয়ে যায়। একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, অন্যজন রাজাকার বনে যায়! এসব জায়গাতেই ছবিটা অন্যরকম। কারণ এমনটাই তো ছিল সেই মফস্বল বা শহরের যাপিত জীবনকাল। সাজু খাদেম রাজাকারের চরিত্রটা দারুণভাবে নিভিয়েছেন। সজল অবশ্য তার প্রচলিত ঢঙেই ছিল এ ছবিতেও। তবে মুগ্ধ হতে হয় সানজিদা প্রীতির অভিনয়ে। কী পরিমিত অভিব্যক্তি! এই ছবিতে এত এত গুণী শিল্পীরা কাজ করেছেন। যারা স্বস্ব ক্ষেত্রে সকলেই পরীক্ষিত। তাই সংলাপ আর তাদের চরিত্রের বিভাজন করতে গিয়ে হয়ত লিটু আনামের চরিত্রের শেষটা দেখাতে ভুলে গেলেন নির্মাতা। মনে হলো হঠাৎ করেই সরিয়ে দিলেন চরিত্রকে। শেষটায় তাকে খুঁজছিল দর্শকচোখ।

মধ্যবিত্ত জীবনে সেই একাত্তরেও পাকিস্তানিদের গানের জলসাসহ নানা আড়ম্বর ছিল। সে সকল চরিত্রের দারুণ সাজসজ্জা দেখিয়েছেন অপরূপভাবে। কিন্তু একই সাথে প্রায় অন্যান্য একাধিক চরিত্রেই কড়া মেকআপটা খানিক চোখে লেগেছে। ফেরদৌস শিক্ষক ও পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে সাবলীল। যেন ফেরদৌসিও ঢঙেই ছিলেন। কিন্তু চরিত্র অনুযায়ী হঠাৎ গেরিলা ময়দান থেকে ফেরদৌসের শহরে আসা, শহর থেকে আবার অন্য পয়েন্টে যেভাবে স্থানান্তর দেখিয়েছেন নির্মাতা সেটা খানিক খটকা লাগে। বুঝে নিতে হয়েছে আমাদের। যেন কোনো বাঁধা বিপত্তি নেই!

এসবের বাইরে সেইসব দিনের গল্পের যে মূল খাত তা ছিল অনবদ্য। নব্বই দশক ধরে এগুলো তারেক মাসুদের মুক্তির গান, মাটির ময়না, তৌকীর আহমেদের জয়যাত্রা, রায়হান রাফির দামালের পর হৃদি হকের ‘১৯৭১ :সেইসব দিন’ বাংলাদেশ নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রের ভেতরে অন্যতম মাস্টারপিস হয়ে থাকবে। এই ছবির আয়োজন আর নির্মাতা হৃদি হকের ধারা বর্ণনায় পুরো গল্প বলার ঢঙটা আপনাকে মুগ্ধ করবে বারবার। আমাদের সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্রে নির্মাতাদের একাধিক ছবিতে যে কাঙালপনা দেখা যায়, বাজেটের সংকটে এটা হয় না, ওটা হয় না ভেবে মেনে নিতে হয়। এই ছবিটি সেই ব্যাকরণের বাইরে। যখন যেখানে যা প্রয়োজন তা মিটিয়েছেন নির্মাতা-প্রযোজক। যা হওয়া উচিত।

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াতদের মতো বরেণ্য শিল্পীদের কমবেশি উপস্থিতি এ ছবির অন্য ব্যঞ্জনা তৈরি করে। তখন মিস করতে হয় ড. ইনামূল হককে বারবার। নিশ্চয়ই ছবিটি গড়তেও তার কন্যা বারবার বিভিন্ন চরিত্রের ভেতরে তাকেই খুঁজেছেন। ছবিটির প্রতি হৃদির এই কোমল লালন, অতি যত্নের ছাপ খুব চোখে পড়ে তাই। বারবার মোহগ্রস্ত রাখে। এমন নির্মাতার তাই চলচ্চিত্রে খুবই নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন।

এত পরিশ্রমের একটি কাজ যেকোনো সিনেমাপ্রেমী ও দেশপ্রেমিকের দেখা উচিত। এদেশের প্রতি, নিজ জন্মভূমির প্রতি তো আমাদের প্রত্যেক নাগরিকেরই দায় রয়েছে। যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে সততা নিয়ে তা আমরা কতটুকুই বা করি, বা করতে চাই! সেখানে এই ছবিটি যেন নির্মাতা দেশের প্রতি এক অসাধারণ দায় পূরণ করলেন। ধন্যবাদ হৃদি হক। শুভেচ্ছা ছবির সকল কলাকুশলীদের প্রতি।

ইত্তেফাক/জেডএইচ