উপলক্ষ নির্বাচন

ভুয়া মামলায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অপচেষ্টা

পুরোনো মামলাকেও ব্যবহার করা হচ্ছে হাতিয়ার হিসেবে

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৩, ০৭:১৫

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ভুয়া মামলা, পুরোনো মামলাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অনেকেই এখন ভুয়া মামলার আশ্রয় নিচ্ছেন। বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের এই অপচেষ্টা আবারও শুরু হয়েছে। নির্বাচন এলেই এই চেষ্টা শুরু হয়। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের কারাগারে আটকে রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই ভুয়া মামলা। এ ধরনের কাজে সহযোগীর ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও। সঠিক তদন্ত ছাড়াই গোঁজামিলের চার্জশিট দাখিল হচ্ছে আদালতে। যদিও আদালতে এসব মামলা শেষ পর্যন্ত টিকছে না। তবু প্রতিপক্ষকে কারাগারে কিছুদিন আটকে রাখার কৌশল হিসেবেই এই কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ মিলেছে।

এ ধরনের কয়েকটি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাদী নিজের যে পরিচয় মামলায় ব্যবহার করছেন, সেটাও সঠিক নয়। এসব মামলায় যাদের আসামি করা হচ্ছে, তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষ। অথচ অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে এক জন মুদি দোকানদারকে পথের মধ্যে আটকে ৩ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার। এই মামলায় আবার পুলিশ চার্জশিটও দিচ্ছে। বাদী যে নিজেকে মুদি দোকানদারের পরিচয় দিলেন, তিনি যে আসলেই মুদি দোকানি কি না, সেই খোঁজও নিচ্ছে না।   

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আসলে এলাকার বখাটে ঐ ব্যক্তি কোনো মুদি দোকানের মালিক নন। এ ধরনের ভুয়া মামলার অভিযোগ এলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।

ভুয়া মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ইত্তেফাককে বলেন, ‘কেউ যদি ভুয়া মামলা করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। পাশাপাশি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি এ ধরনের মামলায় চার্জশিট দেন, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোনো তদন্তকারী অফিসার চাইলেই চার্জশিট দিতে পারেন না। কারণ প্রতিটি মামলার তদারককারী কর্মকর্তা থাকেন। ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসাররা এই কাজটা করেন। ফলে সেখানে বিষয়টি মনিটরিং করা হয়। একই সঙ্গে কোনো মামলায় যদি কারো বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট থাকে, তাহলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবেই।’

গত ফেব্রুয়ারিতে সাভারের এমন একটি ঘটনায় হাইকোর্ট ভুয়া মামলাকারীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পিবিআইকে দেওয়া হয়েছিল সেই মামলার তদন্তের দায়িত্ব। পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, সেটাও জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। এমন ঘটনা এখন দেশের প্রতিটি এলাকায়ই ঘটছে।

এদিকে পুরোনো মামলার আসামির তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো রাজনৈতিক মামলার আসামিদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি সদর দপ্তরে এক জরুরি বৈঠকে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ ধরনের নির্দেশনাকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পুরোনো মামলায় অজ্ঞাত আসামিদের জায়গায় নাম দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অবৈধ অর্থের লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন সব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। 

একটি জেলা শহরের একজন রাজনৈতিক কর্মী বলেন, ‘আমি আগে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে কাজ করতাম। এখন ব্যবসা করি। কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে যাই না। অথচ কয়েক দিন আগে স্থানীয় থানার এক এসআই আমাকে জানালেন ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। না দিলে পুরোনো পেন্ডিং মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হবে। টাকা দেওয়ার জন্য সাত দিন সময় দিয়েছেন। এখন তো আমি মহাবিপদে পড়েছি। ৫০ হাজার টাকা কোথা থেকে দেব! দোকানদারি করি, যা দিয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না। শুধু আমি না, এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখলাম, আরও অনেককেই টাকার জন্য এমন তাগাদা দিয়েছে পুলিশ।’

আবার অন্য একটি থানা শহরের একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী জানালেন, ‘আমাদের দল তো সরকারের বিরুদ্ধে না। তার পরও আমাদের দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠাচ্ছেন সরকারি দলের স্থানীয় কিছু নেতা। কেন্দ্রীয় নেতারা হয়তো বিষয়টি জানেন না। এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্যই স্থানীয় কয়েক জন নেতা পুলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই অপচেষ্টা করে যাচ্ছেন, যাতে আমরা নির্বাচনের সময় জেলে থাকি। আবার কিছু পুলিশ সদস্যও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ফলে আমাদের পক্ষে এলাকায় থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই মিথ্যা মামলা নিয়ে আদালতে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।’

নির্বাচন এলেই কেন এই প্রবণতা, জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বা নিজ দলের প্রতিপক্ষকে বা শরিক দলগুলোর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ কারো বিরুদ্ধে মামলা হলে সেটা সংবাদমাধ্যমে আসছে। এতে ঐ ব্যক্তি সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন। পাশাপাশি এই মামলা মোকাবিলা করতে তাকে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে পুলিশের একটা করণীয় আছে। কেউ মামলা করতে এলেই সেটা না নিয়ে অন্তত প্রাথমিকভাবে যাচাই করে সেটা নেওয়া উচিত। হামলা-মামলা এখন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির “অলংকার” হয়ে গেছে। আগে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হতো, এখন সেটা প্রতিহিংসায় পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় যে সমস্যা,সেটা হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাপে পড়ে যে মামলা নিচ্ছে, সেখানে আজ যারা ক্ষমতাশালী, কাল তারা ক্ষমতাশালী না-ও থাকতে পারেন। কিন্তু এটা তো সংস্কৃতি হয়ে যাচ্ছে। ফলে পরবর্তী সময়ে যিনি ক্ষমতায় আসবেন, তিনিও একই পথ বেছে নেবেন। এটা যদি চলতেই থাকে তাহলে এ ধরনের কুসংস্কৃতি থেকে কখনোই আমরা বের হতে পারব না।’

ইত্তেফাক/এমএএম