মুনতাহার বয়স যখন ২১ মাস তখনই তার চোখের টিউমার ধরা পড়ে। এর আগে চোখের পানি পড়া সমস্যা নিয়ে তাকে এ হাসপাতাল ঐ হাসপাতাল করে অনেক সময় পরীক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় হয়। অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) তার চোখের অপারেশন হয়। তার বাবা আল আমিন ২১ দিন পর পর এখন তাকে কেমোথেরাপি দিতে এই হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তার দুই চোখেই টিউমার, তবে ডান চোখ ফেলে দিতে হয়েছে। প্রত্যেক কেমোতে তার ৫-৭ হাজার টাকা খরচ হয়। আর রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষায় প্রতিবার ৩-৪ হাজার টাকা খরচ চলে যায়। এই চিকিৎসা তার জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান আল আমিন। শুধু আল আমিনই নন, তার মতো অনেক বাবা-মাই শিশুদের ‘হেড-নেক’ ক্যানসার নিয়ে চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
দেশের মোট শিশু ক্যানসার রোগীর ৮-১০ শতাংশ ‘হেড-নেক’ ক্যানসারে আক্রান্ত বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা। তাদের মতে শিশু ক্যানসার জিনগত কারণে হয় বলে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। আবার শনাক্ত দেরিতে হয় বলে, চিকিৎসাও চ্যালেঞ্জ। ব্যয়বহুল হলেও দেশে আধুনিক চিকিৎসা হচ্ছে বলে জানান তারা। তবে তা চাহিদার তুলনায় কম।
বাড়ছে রোগীর সংখ্যা :জিসানের বয়স দুই বছর পাঁচ মাস। তার মাথায় একটি টিউমার ধরা পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অপারেশন করা হয়। অপারেশন করাতে তার তেমন টাকা না লাগলেও, কেমোথেরাপি দিতে তার অনেক টাকা খরচ হয়। ফরিদপুর আলফাডাঙ্গা থেকে আড়াই বছরের ছেলের চোখের টিউমার নিয়ে একই হাসপাতালে আসেন বাবা রফিকুল ইসলাম। রফিকুল গতকাল বিএসএমএমইউতে কেমো দিতে আসেন। ইত্তেফাককে বলেন, ২ বছর ৩ মাস বয়সে তার ছেলের চোখে টিউমার ধরা পড়ে। এখন তার বয়স ২ বছর ৭ মাস। ২১ দিন পরপর তাকে কোমো দিতে হচ্ছে। প্রতিবারই তার ৭ হাজার টাকা কোমো আর ৩-৪ হাজার টাকা পরীক্ষায় চলে যায়। তিনি এক জন কৃষক। তার পক্ষে এত ব্যয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্তব্যরত চিকিৎসক আরজু জানান, এখন সে এখানে ভর্তি না, কেমো নিতে আসেন। তাদের অনেক রোগী আছে যারা প্রতিদিনই আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে হেড-নেক ক্যানসারও আছে। হেড-নেক ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ছে। এখন ক্যানসার শনাক্তকরণ বাড়ছে।
ক্যানসার রোগতত্ত্ব ও গবেষণাকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের শিশুদের ক্যানসার শনাক্তকরণই বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুরা উপসর্গ বলতে পারে না। রোগ নির্ণয় দেরিতে হলে চিকিৎসাও দেরিতে শুরু হয়। হেড-নেক ক্যানসারের মধ্যে নাকের, চোখের, মাথার আর গ্রন্থির ক্যানসার বেশি হয়।
বিজ্ঞজনেরা যা বলেন :বিএসএমএমইউর শিশু ক্যানসার ও রক্তরোগ বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ টি এম আতিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, শিশুদের যত ক্যানসার হয় তার মধ্যে ২য় অবস্থানে আছে গ্রন্থি ক্যানসার। শিশুদের ১০ শতাংশ হেড-নেক ক্যানসার নিয়ে আসেন। গ্রন্থির ক্যানসারে সাধারণত মুখের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়। চোখের ওপর, ঘাড়ে, কানের নিচে ফোলা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলেন তিনি। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা, থেমে থেমে জ্বর, দীর্ঘদিন মাথাব্যথা হলেও সত্বর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, দেশে আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যমান। সঠিক সময় চিকিৎসা নিতে পারলে ১০০ শতাংশ শিশু সুস্থ হয়।
তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য দেশে যথেষ্টসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব আছে বলে জানান জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু ক্যানসার বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক রাশেদ জাহাঙ্গীর কবীর। তিনি বলেন, শিশুর ক্যানসারের প্রধান প্রতিবন্ধকতা রোগ নির্ণয় বিলম্ব। আমরা শিশুর ক্যানসার আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ রোগীকে পাই চিকিৎসার জন্য। তাদের অর্ধেক আবার ক্যানসারের চিকিৎসা করান না। ফলে অর্ধেককে আমরা চিকিৎসা দেই। এই অর্ধেকের কমসংখ্যকই সঠিক সময় রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিতে আসেন।
শিশু ক্যানসার ব্যয় কমানোর বিষয় অধ্যাপক ডা. এ টি এম আতিকুর রহমান হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। এই কার্যক্রমে রোগী আবেদন করলে ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার জন্য এককালীন অর্থ দেওয়া হয়।
