গবেষণা প্রতিবেদনে তথ্য

নগর দরিদ্রের ২৩ শতাংশের নেই জাতীয় পরিচয়পত্র, অর্ধেকের নেই জন্মনিবন্ধন

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৭:০০

নগর দরিদ্রদের ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের ২৩ শতাংশের নেই জাতীয় পরিচয় পত্র, ৫২ শতাংশের নেই জন্ম নিবন্ধন সনদ। একটি জরিপ ফলাফল প্রকাশকালে গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত এ তথ্য দেন। তিনি বলেন, এক জন নাগরিক যে একটি দেশের নাগরিক তার কিছু চিহ্ন থাকে। অন্তত কাগজে কিছু থাকাটাও মন্দের ভালো। অথচ ছোটখাটো বিষয়েও দরিদ্র মানুষের অগ্রাধিকার তলানিতে। 

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে ‘বাংলাদেশে নগর দারিদ্র্য: ভূমি, অভিবাসন, মৌল সেবা’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। সভাপতিত্ব করেন মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট  সুলতানা কামাল। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ এবং এএল আরডি এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।

বস্তিবাসীদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত আরও বলেন, নগরীর দরিদ্র একটি পরিবারের মাসিক খরচের ৫৭ শতাংশ (মাসে ৭ হাজার ২৬৮ টাকা) যায় খাবার কিনতে। যে মানবেতর পরিবেশে তারা বাস করেন, সেখানকার মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের পেছনে বাসাভাড়া বাবদ চলে যায় ২৫ শতাংশ (মাসে ৩ হাজার ১৮৮ টাকা)। ১১ শতাংশের  মতো যায় ডাক্তার-পথ্যে, (মাসে ১ হাজার ৪০২ টাকা)। আর মাত্র ৩ শতাংশ (মাসে ৩৮৩ টাকা) তারা খরচ করতে পারেন শিক্ষায়। নগর দরিদ্রের সঞ্চয় বলে কিছু থাকছে না, ব্যয় কমাতে হচ্ছে স্বাস্থ্য ওষুধপথ্য ও শিক্ষায়। ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্য-দারিদ্র্য ও শিক্ষা-দারিদ্র্য। সুতরাং যেভাবে খাদ্য পণ্যের দাম বাড়ছে সে অনুযায়ী মজুরি বাড়ছে না।  তাতে করে এই দারিদ্র্য ক্রমবর্ধমান।

তিনি বলেন, বস্তি অঞ্চলে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেই বললেই চলে। সরকারি হিসাব মতে, নগরের গড়ে ৬৫ শতাংশ মানুষ উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা পায়? কিন্তু নগর দরিদ্রদের মধ্যে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ। নিরাপদ পানিতে অভিগম্যতা দেশে শতভাগ বলা হচ্ছে, সেখানে নগর দরিদ্রদের মধ্যে এই হার মাত্র ৩৩ শতাংশ। তিনি বলেন, গ্রামের মানুষ কর্মসংস্থানের অভাবে ‘গলা ধাক্কা অভিবাসনের’ শিকার হয়। এই হার ৪৫ শতাংশ। এছাড়াও, এমন গলা ধাক্কার প্রধান প্রধান কারণ হলো:কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে লাগামছাড়া খরচ বৃদ্ধি, প্রয়োজনের সময় কৃষি ঋণ না পাওয়া, উৎপাদনের ন্যায্য দাম না পাওয়া প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নগর দরিদ্র এগুলো উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও, নদী ভাঙন গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের একটি অন্যতম বড় নিয়ামক। বস্তি ও নিম্ন আয়ের বাসিন্দাদের কম পক্ষে ৮২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বস্তিবাসীদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ যেখানেই হাত দেওয়া হয়েছে প্রতিটি স্তরেই তাদের একটি বেদনাদায়ক চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণা থেকে জানা গেছে, বস্তিবাসীরা ক্রমাগত দরিদ্রায়নের মধ্যে বসবাস করছে। যে মৌলিক পাঁচটি অধিকারের কথা বলা হয় তারা তা থেকেও অনেক দূরে। 

তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু টিকে থাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি আদর্শিক ভিত্তি ছিল। দেশের প্রতিটি মানুষ সমপরিমাণ সুযোগ সুবিধা নিয়ে চলার কথা ছিল। যারা বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন তারা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করেন তবেই পরিবর্তন সম্ভব।’

অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান বলেন, যে নগরায়ন ও শিল্পায়নকে ভিত্তি করে দেশের উন্নয়ন হয়, দেশে সে উন্নয়ন হচ্ছে না। পোশাক শিল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এই শিল্পের সবকিছুর জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। সবকিছু দেশে উৎপন্ন করে এ শিল্প হলে উন্নয়ন টেকসই হতো। দেশে উন্নয়নের গুণগত ও পরিবেশগত পরিবর্তন দরকার। 

ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্য, নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য, শহর গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে হবে। 

শামসুল হুদা বলেন, দেশের দরিদ্ররা বোঝা নয়, অবৈধ ধনীরাই বোঝা। তারা টাকা রোজগার করে না, দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করে টাকা বিদেশে পাঠায়। তিনি বলেন, ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে, তারা সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। বেশির ভাগ বৈষম্যের শিকার হয় নারী ও শিশুরা। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে বস্তিবাসীর জন্য সংবিধান লঙ্ঘিত হয়।

ইত্তেফাক/এমএএম