ব্যবসায়ীদের অতিলোভ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ: ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৩, ১৭:৫৭

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষ কীভাবে যে জীবন ধারণ করছে সেটা কল্পনা করা যায় না। মানুষের সঞ্চয় তলানিতে পড়েছে বা শেষ হয়ে গেছে। ধার-কর্য করছে। মানুষ কষ্টে আছে। ব্যবসায়ীদের অতিলোভ বাজার দরের বৃদ্ধির কারণ। 

বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে (বিএফডিসি) ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণে বাজার মনিটরিং নিয়ে এক ছায়া সংসদের প্রধান অতিথির বক্তব্যে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান এ কথা বলেন। 

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র আয়োজনে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

ক্যাব সভাপতি বলেন, ক্যাবিনেটে ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী। সংসদ ও সরকারের মধ্যে রাজনীতিবিদদের তুলনায় ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য থাকলেও নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, মনিটরিংয়ে তার প্রতিফলন নাই। দাতাদের পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার ও মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করলেও মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যবসায়ীরা ফ্রাংকেস্টাইন হয়ে গেছে। তাদের কঠোর হাতে রুখতে হবে। 

গোলাম রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের আগুনে দাহ হওয়া ভোক্তাদের কেবল বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে স্বস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। সরকার বলছে সিন্ডিকেট নাই। কিন্তু কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করলে সেটা কি সিন্ডিকেট নয়। গত অর্থ বছরে সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে সরকার ৯৯ হাজার কোটি টাকা লোন নিয়েছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে লোন নেয়া মানে সেন্ট্রাল ব্যাংকের টাকশাল থেকে টাকা ছাপাইয়া সরকারকে লোন দেওয়া। বাজারে যদি মানি সাপ্লাই বাড়ে তাহলে পণ্যমূল্য বাড়ে। দ্রব্য মূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয় বাড়লে ও কর্মসংস্থান তৈরি হলে ভোক্তাদের কষ্ট কম হয়। 
 
ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, মনিটরিং করে তাৎক্ষণিকভাবে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধি কারণে আমদানি পণ্যের দাম যে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারে পণ্য এবং দেশে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির জন্য, আমদানি পণ্যের দাম বাড়তে পারে কিন্তু দেশে উৎপাদিত পণ্যের হুটহাট মূল্যবৃদ্ধি; সিন্ডিকেট এবং বিপণন ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ছাড়া আর কিছুই নয়।

সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি‘র হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সিন্ডিকেট এক আতঙ্কের নাম। মাঝে মাঝে মনে হয় এই সিন্ডিকেটের কাছে শুধু ক্রেতা সাধারণ নয়, সরকারও জিম্মি হয়ে পড়ছে। কয়েকটি কর্পোরেট কোম্পানির বিরুদ্ধে পণ্য মূল্য বৃদ্ধির অভিযোগের প্রতিবেদন পাওয়ার পরও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এতে মনে হতে পারে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না করার পিছনেও সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতা রয়েছে। আমরা ভোক্তা অধিকারকে দেখতে পাই কাঁচামরিচ, ডিম, ডাব বিক্রেতাদের নিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে হুঁশিয়ারী দিতে। কিন্তু যেসব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চিনি, ভোজ্যতেল, ডিম এবং ব্রয়লার মুরগির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের কারসাজিতে পাইকারি বা খুচরা ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্যে পণ্য পায় না সেই সকল কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারকে আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। তা নাহলে মনে হতে পারে বড় বড় কয়েকটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাজার ব্যবস্থাপণা জিম্মি হয়ে যাচ্ছে। তবে আমরা কোনোভাবে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নয়। তারা বড় বড় পুঁজি নিয়ে বাজারে আসে। লাভ যেমন থাকে ঝুঁকিও তেমনি থাকে। তাই ভ্যাট-ট্যাক্স ব্যবস্থাপণাকে সহনীয় রেখে সরকারকে বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দিতে হবে। একই সাথে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে নতুন বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা প্রদান করে বাজার সিন্ডিকেট বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবে উৎপাদন বাড়াতে পারলে বাজার সিন্ডিকেট করা সম্ভব হবে না। বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানি যাদের ওপর বাজারের দ্রব্যমূল্য অনেকখানি নির্ভর করে তারা প্রত্যেকেই সমাজের মর্যাদাবান ও বিত্তশালী। তাই এই সকল কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর কাছে অনুরোধ আপনারা সাধারণ মানুষের কল্যাণে বাজার ব্যবস্থাপণাকে স্থিতিশীল রাখবেন। যাতে এদেশের মানুষ সবসময় আপনাদের অবদানের কথা স্মরণ রাখে।

‘কেবল বাজার মনিটরিং এর মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সম্ভব নয়’ শীর্ষক ছায়া সংসদে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকদের পরাজিত করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিতার্কিকরা বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করে। 

প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন সাংবাদিক মাঈনুল আলম, সাংবাদিক আবুল কাশেম, সাংবাদিক কাবেরী মৈত্রেয় ও সাংবাদিক শাহ আলম খান। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী দলকে ট্রফি ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। 

ইত্তেফাক/পিও