এই চক্রব্যূহ ভেদ করা সম্ভব কি?

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৭:৪৫

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলিতেছে। অর্জুনপুত্র অভিমন্যু ছিলেন তাহার পিতার মতো অপতিরোধ্য বীর। যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে অর্জুনদের প্রতিপক্ষ দুর্যোধনের সেনাপতি দ্রোণাচার্য অভেদ্য চক্রব্যূহ তৈরি করেন। অভিমন্যু এই চক্রব্যূহে প্রবেশের উপায় জানিতেন, কিন্তু উহা ভেদ করিয়া বাহির হইবার উপায় জানিতেন না। ভয়ংকর যুদ্ধের ময়দানে অভিমন্যু উপায়ান্তর না দেখিয়া ব্যূহে প্রবেশ করেন। প্রতিপক্ষের সহিত প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ এমন স্তরে স্তরে ব্যূহের জাল বিছাইয়া রাখিয়াছিলেন যে, সেই জাল ছিন্ন করিয়া ব্যূহ হইতে বাহির হইবার ক্ষমতা মহাবীর অভিমন্যুর ছিল না। তিনি প্রতিপক্ষের বেষ্টনীর মধ্যেই গদাঘাতে নিহত হন। তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, এই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরুতে অর্জুন যখন যুদ্ধ করিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগিতেছিলেন, তখন তাহার রথের সারথি শ্রীকৃষ্ণ জানাইয়াছিলেন যে, অর্জুনের এইরূপ দ্বিধা করিবার কোনো কারণ নাই। কারণ, এই যুদ্ধে অর্জুন নিমিত্ত মাত্র, যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই শ্রীকৃষ্ণ সকলকে মারিয়া রাখিয়াছেন এবং অর্জুনদের বিজয় পূর্ব হইতেই সুনির্দিষ্ট করা আছে।

বিদ্বজ্জনেরা  এই ক্ষেত্রে বলিতে থাকেন—দেবতারা কোনো বিজয় পূর্বনির্ধারিত করিয়া থাকেন অধর্ম দূর করিয়া সেইখানে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য। কিন্তু মানুষ একই কাজ করে অধর্ম বা দুর্নীতিকে আশ্রয় করিয়া। একই কাজ মানে কোনো বিজয় পূর্বনির্ধারিত করিয়া দেওয়া। মানুষ যেই হেতু এই কাজটি অধর্ম বা দুর্নীতিকে আশ্রয় করিয়া সম্পন্ন করে, এই জন্য মানুষের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত জয়ের ফল কখনো শুভ হয় না। দুঃখজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই পূর্বনির্ধারিত বিজয় নিশ্চিত করা হয় কথিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে। যাহার ভিত্তির ওপর গণতন্ত্র দাঁড়াইয়া থাকে, সেই ‘নির্বাচন’ ম্যানিউপুলেট করা হয়। এই ব্যাপারে বিশ্বের স্বনামধন্য কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলিতেছে, নির্বাচন কারচুপির মেকানিজমটা উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশ খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে। ক্ষমতাসীন দল তাহার প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন কমিশনের সহিত যোগসাজশের মাধ্যমে একদম তৃণমূল পর্যন্ত নির্বাচনকে নিজের মতো সাজাইতে পারেন। এমতাবস্থায় যখন বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্বাচন’ হইতে হইবে, তখন স্মরণ করিতে হয় অভিমন্যুর কথা—যাহার চারিদিকে জাল বিছানো ছিল, যাহাতে তিনি কিছুতেই চক্রব্যূহ ভেদ করিয়া বাহির হইতে না পারেন। একইভাবে একটি সুষ্ঠু তথা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্বাচন করিবার জন্য যেই ‘ব্যূহ’ ভেদ করিতে হইবে—দৃশ্যত তাহা অসম্ভব বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। এবং এই ক্ষেত্রে অভিমন্যুর পরিণতি আমরা জানি। তাহা হইলে কী এখন উপায়? প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক জহির রায়হান তাহার ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে একটি গান ব্যবহার করিয়াছিলেন—‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’। সুষ্ঠু নির্বাচনের যাবতীয় শর্ত যেই ‘খাঁচা’য় বন্দি হইয়া গিয়াছে—তাহা ভাঙা সম্ভব নহে বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। কারণ সামাজিক, পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত কারণে প্রশাসনে যাহারা থাকেন, সরকারের উপর তাহাদের নির্ভর করিবার বিষয়টিও এত সহজে দুঃসাহসিক হইবার নহে।

বস্তুত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতার পালাবদলের জন্য যেই শর্ত ও মূল্যবোধ প্রত্যাশা করা হয়—এই দেশগুলি তাহা হইতে শত যোজনপথ দূরেই থাকিয়া যাইতেছে। তৃতীয় বিশ্বে ক্ষমতাসীনরা অতি দক্ষ, অতি কৌশলী, অভাবিত স্মার্ট হইয়া উঠিয়াছে তাহাদের ক্ষমতার অপরাহ্ন বেলাকে পিছাইয়া দিতে। ইহা ঠিক যে, এই অবস্থা হইতে মুক্তি পাইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একসময় হয়তো বিপ্লব হইবে, অদমনীয় আন্দোলন হইবে। কিন্তু শান্তি আসিবে কি? দুঃখজনকভাবে, এই ধরনের বিপ্লব ও আন্দোলনে যেই লোকক্ষয়, রক্তক্ষয়, সম্পদক্ষয় হইবে—তাহার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন