রোববার, ০১ অক্টোবর ২০২৩, ১৬ আশ্বিন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

অস্বাভাবিক দ্রুততায় হত্যা মামলার আসামির মুক্তি, প্রশ্ন চেম্বার আদালতের

আসামিকে আত্মসমর্পণ ও ঘটনা তদন্তের নির্দেশ

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:৪৫

হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে কারামুক্ত হয়ে যান হত্যা মামলার আসামি। উচ্চআদালত থেকে এত দ্রুত জামিন আদেশ কীভাবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে কারাগারে পৌঁছাল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম।

একসঙ্গে ফৌজদারি শাখার তত্ত্বাবধায়ককেও তাৎক্ষণিক তলব করেন। বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) শুনানি নিয়ে চেম্বার আদালত এ আদেশ দেয়।

শাখার কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের জামিন আদেশ ডেসপাস শাখা থেকে যাবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। সেই আদেশের কপি ওয়েবসাইটে যাচাইকরন শেষে জামিননামা মঞ্জুর করবেন ম্যাজিস্ট্রেট। এরপর জামিননামা কারাগারে গেলে মুক্তি পায় আসামি। এরপরই চেম্বার আদালত ওই হত্যা মামলার আসামির জামিন স্থগিতের পাশাপাশি তাকে ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কুমিল্লার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এছাড়া, কুমিল্লার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে ব্যাখা দিতে বলা হয়েছে।

আদালত বলেছেন, হাইকোর্টের মূল আদেশ প্রাপ্তির আগেই কোন প্রক্রিয়ায় জামিননামা মঞ্জুর করেছে তার ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার তদন্ত করতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছে, মামলার আসামি কোন প্রক্রিয়ায় এত দ্রুত জামিন আদেশ সই স্বাক্ষরের পর আদালত থেকে নামিয়ে নিয়েছে তার তদন্ত করে ৬ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

শুনানি: গত ৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ থেকে জামিন পান কুমিল্লার যুবলীগ নেতা জামাল হত্যা মামলার আসামি সোহেল সিকদার। জামিনের তিন ঘণ্টার মধ্যেই তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হন। জামিনের এই আদেশ স্থগিত ও আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশনা চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

আবেদনের শুনানিতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, জামিনের পর অসস্বাভাবিক দ্রুততায় মুক্তি পেয়েছে আসামি। এই মুক্তির প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন আমাদের।

জবাবে আসামির কৌসুলি সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি মোমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, আমাকে গ্রেপ্তারের দুইদিন পর আদালতে হাজির করেছে। এই দুইদিন আমাকে কোথায় রেখেছিলো? আর আমার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে তার সবগুলোই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সেগুলো থেকে খালাস পেয়েছি।

আরেক আইনজীবী মুরাদ রেজা বলেন, অস্বাভাবিক দ্রুততার কারনে আমার জামিন বাতিল হওয়ার সুযোগ নাই। জামিনের পর এক সেকেন্ডও আমাকে আটকে রাখার সুযোগ নেই।

এ পর্যায়ে আসামির আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, জামিনের তিন ঘণ্টার মধ্যে আদেশের কপি পৌঁছে যাওয়ার কোন নজির আছে কি? শত শত জামিন হয় হাইকোর্ট থেকে সেখানে কটা জামিন আদেশ এভাবে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে পৌছে বলুন?

আইনজীবীরা বলেন, ‘আমি তো কোনো প্রতারণা করে জামিন নিইনি।’

বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, আমরা জামিন নিয়ে কথা বলছি না। জামিন আদেশ পৌছানো ও জামিননামা মঞ্জুরের ক্ষেত্রে অনিয়ম দেখতে পাচ্ছি। এই বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দিন। তিনি বলেন, যিনি পয়সা খরচ করবেন, ঘাটে ঘাটে তদবির করবেন তার জামিন আদেশ আগে পৌছবে ব্যাপারটা কী সেই রকম?

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ থেকে ১৮টি মামলায় জামিন হয়েছে। এর মধ্যে দুটি আদেশ অস্বাভাবিক দ্রততায় পৌঁছেছে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মো. মোরসেদ বলেন, আসামি সোহেলকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে হাজির করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।

শুনানি নিয়ে চেম্বার আদালতের বিচারপতি হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিতের পাশাপাশি আসামিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।

ঘটনাক্রম: চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল রাত আটটার দিকে দাউদকান্দির গৌরীপুর পশ্চিম বাজার ঈদগাহ এলাকার মসজিদ গলিতে যুবলীগ নেতা জামাল হোসেনকে (৪০) গুলি করে হত্যা করে বোরকা পরিহিত দুর্বৃত্তরা। এ হত্যাকান্ডের দুইদিন পর ২ মে দিবাগত মধ্যরাতে নয়জনের নাম উল্লেখ করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী পপি আক্তার। মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে সোহেল অন্যতম। যিনি তিতাস উপজেলার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। গত ৬ মে তাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

দুটি বেঞ্চে জামিন আবেদন: নিম্ন আদালতে জামিন না মঞ্জুরের পর হাইকোর্টে জামিন চান এই আসামি। গত ২৭ জুলাই বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। এরপর ৩ ও ১০ আগস্ট আবেদনটি কার্যতালিকায় ছিলো। ১০ আগস্ট জামিন জামিন আবেদনটি খারিজের আদেশ দিতে চাইলে আসামি আইনজীবী তা ‘নন প্রসিকিউশনথ করে নেন। এরপর ২৮ আগস্ট বিচারপতি মো. বদরুজ্জামান ও বিচারপতি এসএম মাসুদ হোসেন দোলনের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে আসামির জামিন চেয়ে পুনরায় আবেদন করেন। এরপর আবেদনটি শুনানির জন্য টানা তিন কার্যিদবস কার্যতালিকায় আসে। ৩১ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, ইতিপূর্বে জ্যেষ্ঠ হাইকোর্ট বেঞ্চ জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। এরপর এখানে পুনরায় জামিন চেয়েছে। তখন জামিন আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে ডিলিট করে দেয় ওই বেঞ্চ।

দুই দিনের মধ্যে দুটি বেঞ্চ থেকে জামিন না মেলায় অবকাশকালীন বেঞ্চে জামিন আবেদনটি নিয়ে যান আসামির আইনজীবী। অবকাশের প্রথম দিন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চের আনলিস্টেড মোশন হিসাবে জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য ছিলো। গত রবিবার শুনানি নিয়ে আসামি সোহেল সিকদারকে জামিন দেয় হাইকোর্ট। ওই জামিনের বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষ। আদালত আদেশে বলেছেন, মামলার সকল বিষয়াদি বিবেচনা করে আমরা আসামিকে অন্তবর্তিকালীন জামিন দিতে সম্মত হয়েছি। অন্তবর্তিকালীন জামিনের পাশাপাশি চার সপ্তাহের রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।
এই জামিন আদেশ দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর ওইদিনই তা কুমিল্লার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৌছে যায়। সেখানে জামিননামা দাখিল ও স্বাক্ষরের পর যায় কারাগারে। এরপই বিকালে মুক্তি পায় হত্যা মামলার এই আসামি। 

অস্বাভাবিক দ্রুততায় মুক্তি: হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চ থেকে মেলেনি জামিন। ২০ দিনের মাথায় জামিন পেয়েছেন অবকাশকালীন বেঞ্চ থেকে। যেদিন জামিন মিলেছে সেদিনই জামিন আদেশ অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে পৌছেছে কুমিল্লার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। জামিন আদেশ পৌছানোর পরই দাখিল করা হয়েছে জামিননামা। জামিননামায় স্বাক্ষরের পর তা পৌছে কুমিল্লা কারাগারে। এরপরই বিকালে মুক্তি পান যুবলীগ নেতা জামাল হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. শাহীনুল ইসলাম ওরফে সোহেল সিকদার। এজাহারভুক্ত আসামির মুক্তিতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন মামলার বাদী। এদিকে হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আবেদনে মুক্তি পাওয়া আসামিকে গ্রেপ্তারে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়। আজ বুধবার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এই আবেদনের ওপর শুনানি হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, ২০ দিনের মধ্যে তিনটি বেঞ্চে জামিনের চেষ্টা। এরমধ্যে দুটি বেঞ্চ জামিন দেয়নি। তবে অবকাশকালীন বেঞ্চ থেকে জামিন হাসিল করেছে আসামির আইনজীবী।

তিনি আরও বলেন, যে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে জামিন আদেশ হাসিল করা হয়েছে তাতেই আমাদের আপত্তি। এছাড়া, যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় হাইকোর্টের জামিন আদেশ কারাগারে পৌছানো হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে প্রতিটি জায়গায় লোক প্রস্তুত করা ছিলো। যার কারনে জামিন হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আসামি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে গেল। সেই জামিন আদেশ আজ স্থগিত করেছে চেম্বার আদালত।

ইত্তেফাক/এইচএ