বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

অনলাইন গেমে আসক্তি, সমাধান কোথায়

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৪:১৬

অনলাইন গেম এখন অল্প বয়সীদের এতটাই প্রিয়, একবার গেম খেলতে বসলে ডিভাইস ছেড়ে উঠতেই চায় না তারা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অনলাইন গেমের আসক্তি ক্রমাগত বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়ে স্মার্টফোনে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এতে প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা আসক্ত হচ্ছেন। অনলাইন গেম তরুণদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হলেও এই জনপ্রিয়তা অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন গেম এমন এক ধরনের কাজ, যার মধ্যে আসক্তির উপাদান খুবই তীব্র। অর্থাৎ একবার কেউ খেলা শুরু করলে সেই গেমের প্রতি আশক্তি বাড়তেই থাকে। অনলাইন গেম কিশোর-কিশোরীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়, এখানে তারা আনন্দ পাচ্ছে। কিন্তু এটার পেছনে অনেক ক্ষতিকর দিক আছে। মাদকের যেমন আসক্তি, এটারও তেমন আসক্তি। প্রতিরোধের জন্য মনোচিকিৎসক এবং কাউন্সিলিং করানো হচ্ছে আসক্তদের। এছাড়া পরিবারের দায়িত্বশীল আচরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিও সমাধান হতে পারে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ইন্টারনেট গ্রাহক ১২ কোটি ৬১ লাখের বেশি। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গ্রাহক বেড়েছে ২০ লাখ। দেশের বড় সংখ্যক শিশু-কিশোর এখন পাবজি, ফ্রি-ফায়ার, কল অব ডিউটি, কমব্যাট স্ট্রাইক গো ইত্যাদি অনলাইন গেমে আসক্ত। কৌতূহল থেকে শিশুরা অনলাইন গেম খেলা শুরু করে। একসময় তা নেশায় পরিণত হয়। আসক্তরা আহার-নিদ্রা আর পড়াশোনা ভুলে মত্ত হয়ে থাকে গেমে। প্রযুক্তি এখন মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্মার্ট ডিভাইস ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩-১৭ বছর বয়সী শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি ভিডিও গেম, কম্পিউটার, ই-রিডার, স্মার্টফোনে এবং অন্যান্য স্ক্রিন-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।

অধিকাংশ ভিডিও গেমের কনটেন্টগুলো যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত নিয়ে- যা কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়। শুধু শহরে নয়, ভিডিও গেমসের দিকে ঝুঁকছে গ্রামের শিশু-কিশোররাও। মফস্বলের শিশু কিশোররা একত্রে দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলছে। খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও ভিডিও গেমের দিকে ঝুঁকে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা। তারা জানান, এসব গেমে আসক্তির কারণে কিশোররা পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণায় জানিয়েছে, ভিডিও গেমে আসক্তি এক ধরনের মানসিক রোগ। গেমগুলো কারও জন্য ডিপ্রেশনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু-কিশোররা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যকলাপসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ধাবিত হয় এসব গেমে প্রভাবিত হয়ে। অনলাইন গেমের আসক্তি বাড়ায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার মানসিকতাও কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাও হচ্ছে না তাদের।

এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত নির্ভরতাই আসক্তি। এই নির্ভরতা ব্যক্তি, বস্তু বা কোনো কাজের প্রতিও হতে পারে। অনলাইন গেম এমন এক ধরনের কাজ, যার মধ্যে আসক্তির উপাদান খুবই তীব্র। অর্থাৎ একবার কেউ খেলা শুরু করলে সেই গেমের প্রতি নির্ভরতা বাড়তেই থাকে। কিশোর বয়সে ব্যক্তি তার আত্মপরিচয় খোঁজে, নিজেকে আবিষ্কার করতে চায়। এই সময়ে সকল বিষয়েই তার বেশ উৎসাহ থাকে। সেই উৎসাহ বা কৌতূহল মেটানোর পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর উপায় না থাকলে নানা ধরনের আসক্তিতে পড়তে পারে। ইন্টারনেটভিত্তিক গেম আসক্তি এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গেমে আসক্তি হয়ে কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তরুণরা- এ বিষয়ে আজহারুল ইসলাম বলেন, অন্যসব আসক্তির মতোই অনলাইন গেমে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ ভালো লাগে; না থাকলে শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা দেখা দেয়। আবার দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে থাকার ফলে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়। যেমন অনেকের ঘুম কম হয়। যার ফলে ক্লান্তি ক্লান্তি ভাব লেগেই থাকে। তাদের মধ্যে অনুশোচনাবোধও দেখা যায়। অনেকের সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা কমে যায়, ফলে তারা একাকীত্বে ভোগে।

এসব গেম থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কিংবা এর সমাধান কোথায়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, গেমিং আসক্তি থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। প্রকৃতপক্ষে মানুষ আসক্তি থেকে বের হতে পারে না। আমরা যেটা করতে পারি তা হলো, ক্ষতিকর আসক্তিকে ইতিবাচক আসক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারি। যেমন, গেইম আসক্তিকে সৃষ্টিশীল কোনো কাজ শেখা দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারি। অনলাইন সময় কমিয়ে আনতে পর্যাপ্ত অফলাইন কার্যক্রম (যেমন, খেলাধুলা) বাড়াতে পারি। এ ক্ষেত্রে সচেতন ও সহমর্মী পরিবার এবং পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা ভালো কাজে দেয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহজাবীন হক ইত্তেফাককে এ প্রসঙ্গে বলেন, অনলাইন গেম খুবই আকর্ষণীয়। এখানে তারা আনন্দ পাচ্ছে। আমাদের ব্রেইনের যে অংশটা আমরা আনন্দ উপভোগ করি, এই অনুভূতি যেটা দেয়- এই ধরনের কাজগুলো আসলে আমাদের ব্রেইনের ওই পার্টিকুলার আনন্দ অনুভূত হওয়ার যে অংশটা আছে সেটাকে স্টিমুলেট করে এবং শক্ত করে তোলে। এ কারণে ভালোলাগার হরমোনগুলো সৃষ্টি হতে থাকে। এমনিতে মনে হচ্ছে এটা একটা আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু এটার পেছনে অনেক ক্ষতিকর দিক আছে, ড্রাগের যেমন আসক্তি এটারও তেমন আসক্তি এবং ওই ধরনের স্টিমুলেশন ছাড়া অন্য কিছুতে আনন্দ পাবে না। এতে সে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে ও সামাজিকভাবে সবদিক থেকেই সে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সে আসক্ত হয়ে গেছে। অন্যান্য আসক্তির ক্ষেত্রে যে যে বিষয়গুলো প্রযোজ্য এখানেও ঠিক তাই হচ্ছে।

বিশেষ করে কম বয়সী কিশোর-কিশোরীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান মেহজাবীন হক। তিনি বলেন, এতে ব্রেইনের হেলদি ডেভলপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধরনের আসক্তির ফলে বাচ্চাদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বোধ অর্থাৎ কোনটা ভালো কোনটা খারাপ- এটার মাঝখানে যে একটা সূক্ষ্ম সীমারেখা থাকে এটা নষ্ট হয়ে যায়। এটা তারা বুঝতে পারে না। খুব সহজে তারা যে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের কাছে এটা অপরাধ মনে হয় না। বিভিন্ন যে কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে, এই গেমিং অন্যতম একটি কারণ।

উত্তরণের উপায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উত্তরণের উপায় হচ্ছে প্রথমে আমাদের প্রতিরোধের জায়গাটা দেখতে হবে। আমরা এই টেকনোলজি ছাড়া হতে পারি না, কিন্তু কতটুকু ব্যবহার করবো এটার ব্যাপারে অভিভাবক ও শিক্ষকরা একটা সীমা ঠিক করে দেবে। কম বয়সীদের হাতে একটা মোবাইল তুলে দেব কিনা এবং সেখানে তাদের ইন্টারনেট সংযোগ দেব কিনা, আর দিলেইবা কতক্ষণ দেব। এই লিমিটগুলো যদি না করতে পারি, তাহলে আমাদের অসুবিধাগুলো হবে। যদিও এসব ডিভাইসগুলো আমাদের অনেক কাজে সাহায্য করে, কিন্তু এসব ডিভাইস হাতে তুলে দিয়ে কি বাচ্চাদের আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

প্রতিরোধ ও সমাধানের বিষয়ে ড. মেহজাবীন হক জানান, আসক্ত হওয়ার পর বের হয়ে আসাটা অনেক কঠিন। তখন একটি বাচ্চা অস্বাভাবিক আচরণ করে ফোন না দিলে বাড়িতে ভাঙচুর করে। এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধটা আমাদের সবচেয়ে আগে করতে হবে। এরপর প্রয়োজনে তাকে মনোচিকিৎসক এবং কাউন্সেলিংয়ে আনতে হবে। তার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব বিষয়গুলো থেকে যদি আমরা বের হতে না পারি সেক্ষেত্রে এটা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে। প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাচ্চাদের সময় দেওয়া, বন্ধুসুলভ আচরণ করা এবং তাদের মানুষের মাঝে নিয়ে যাওয়া। তাহলেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ইত্তেফাক/এসকে