রয়টার্সের প্রতিবেদন

কানাডার অভিযোগের অনেক আগেই পশ্চিমা বিশ্বে ভারতীয় গুপ্তচরদের বিচরণ

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ২০:৫৫

প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে এক আতঙ্কের নাম ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং নেপাল সকলের অভিযোগ ‘র’ দেশগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করে। এমনকি সহিংসতার সঙ্গে জড়িত এমন নিষিদ্ধ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও আঁতাত রয়েছে সংস্থাটির।

গত মাসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর অভিযোগ করেন, ভারতীয় সরকারি এজেন্টরা জুন মাসে ভ্যাঙ্কুভার শহরতলিতে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। এরপরই বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’।

তবে জোরালোভাবে কানাডার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারত। কানাডাকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করার দাবিও করেছে দিল্লি। তবে অটোয়া বলেছে, তারা মিত্রদের সঙ্গে তথ্য প্রমাণ শেয়ার করেছে। কিন্তু এর বাইরে তারা এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করবে না।

২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় ১৬৬ জন নিহত হওয়ার পর এজেন্সিটি আরও দৃঢ় আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০০৮ সালের পর ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোতে তার আধিপত্য বিস্তার করেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি।

‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজন অবসরপ্রাপ্ত এবং দুজন ভারতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তারা বলেছেন, ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় ১৬৬ জন নিহত হওয়ার পর এজেন্সিটি আরও দৃঢ় আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিল। কর্মকর্তারা সংবেদনশীল বিষয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

চারজন কর্মকর্তা বলেছেন, ২০০৮ সালের পর ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোতে তার আধিপত্য বিস্তার করেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি। বর্তমান এক কর্মকর্তা মুম্বাই হামলায় জড়িত থাকার জন্য দোষী সাব্যস্ত একজন মার্কিন নাগরিকের প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের ব্যর্থতাকে র-এর পশ্চিমে তার প্রভাব বাড়ানোর মূল প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একজন সাবেক এবং একজন বর্তমান কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোয় ‘র’ তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতার সাংকেতিক এবং কারিগরি দিকগুলোর উন্নয়ন ঘটাতে পারলেও পশ্চিমা বিশ্বে তা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা বিশ্বে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘র’-কে ব্যাপকভাবে মানবিক বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন কর্মকর্তাই বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ভারতের অন্য জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার মতো ‘র’-এর অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে।

বর্তমান ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে ‘র’ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী কৌতূহল বাড়িয়েছে। ‘র-এর কার্যকলাপের বৃহত্তর পশ্চিমা যাচাই-বাছাই দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগগুলিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে উপলব্ধি করতে পারে।’

এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে নরেন্দ্র মোদির কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি। ‘র’-এর প্রধান রবি সিনহার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে তাকে কয়েকটি বার্তা পাঠিয়েছিল রয়টার্স। তিনিও কোনো জবাব দেননি। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মাধ্যমে মোদির কার্যালয়কে রিপোর্ট দেন সিনহা। তার কাছ থেকেও প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে তার কাছ থেকেও সাড়া মেলেনি।

তবে ছয়জন কর্মকর্তাই ‘র’-এর টার্গেটেড হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। এজেন্সির এই ধরনের অভিযানের জন্য কোনো আদেশ নেই বলে জানিয়েছেন তারা। ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এবং বিশ্লেষকরা বলেছেন, ভ্যাঙ্কুভারের ঘটনার ফলে ‘র’ বৃহত্তর বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবে বলে উদ্বেগও সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রিটেনের হাল ইউনিভার্সিটির ভারতীয় গোয়েন্দা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ধীরজ পরমেশা ছায়া বলেছেন, ‘বর্তমান ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে ‘র’ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী কৌতূহল বাড়িয়েছে। ‘র-এর কার্যকলাপের বৃহত্তর পশ্চিমা যাচাই-বাছাই দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগগুলিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে উপলব্ধি করতে পারে।’

চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় দিল্লির সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা প্রসারিত করেছে পশ্চিমারা। ওয়াশিংটন ২০২০ সালে ভারতের সঙ্গে সংবেদনশীল ম্যাপিং এবং স্যাটেলাইট ডেটা শেয়ার করতেও সম্মত হয়েছে। তবে ‍সাময়িকের জন্য হলেও কানাডার অভিযোগ পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ‘র’-কে বিশ্বাস করা কঠিন করে তুলতে পারে বলে একজন কর্মকর্তা বলেছেন।

ট্রুডোর অভিযোগের পর থেকে অটোয়া এবং দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ভারত কানাডার নাগরিকদের নতুন ভিসা প্রদান স্থগিত করেছে এবং অটোয়াকে তার কূটনৈতিক উপস্থিতি কমানোর দাবি জানিয়েছে।

মুম্বাই হামলার পর বেড়েছে উপস্থিতি

পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই ‘র’-কে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। খুব সম্প্রতি পাকিস্তানে একটি মসজিদের কাছে বোমা হামলার জন্য ‘র’-কে দায়ী করেছে ইসলামাবাদ। এ অভিযোগের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে মন্ত্রণালয় থেকে জবাব পাওয়া যায়নি।

২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে হামলার জন্য প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করেছিল ভারত। দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা এ ঘটনাকে ‘র’-এর বড় ধরনের ব্যর্থতা বলে বিবেচনা করে থাকেন। মুম্বাইয়ে ওই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের দায়ী করেছিল দিল্লি।

ইসলামাবাদ দাবি করেছিল, এ ঘটনায় তাদের গুপ্তচরদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ডেভিড হেডলির সংশ্লিষ্টতাকে কেন্দ্র করে উত্তর আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম বিস্তৃত করে ‘র’। রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দেওয়া ওই ছয় কর্মকর্তার একজন বলেন, মুম্বাই হামলার জন্য স্থান নির্বাচনসহ বিভিন্ন অভিযোগে শিকাগোতে ৩৫ বছরের কারাভোগ করছেন হেডলি।

১৯৬৮ সালে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং ১৯৬২ সালে প্রায় একমাস স্থায়ী হওয়া চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে দেশটির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার দায়িত্ব পায় ‘র’। এমনকি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইসরায়েলের মোসাদ এবং সিআইএর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ‘র’-এর।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল মুম্বাই হামলার আগে হেডলির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সতর্ক করেছিল ‘র’। বলা হয়েছিল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে হেডলির সম্পৃক্ততা আছে। ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, হেডলি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডাবল এজেন্ট’। তা ছাড়া হেডলিকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে দিল্লির ব্যর্থতায় হতাশ হয়েছিল ‘র’।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হেডলি ডাবল এজেন্ট ছিলেন না। দিল্লির মার্কিন দূতাবাস এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাবিষয়ক বইয়ের সহলেখক আড্রিয়ান লেভি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নিকট প্রতিবেশী দেশে পরিকল্পিত হত্যা এবং গুমের ঘটনাসহ সরাসরি কোনো পদক্ষেপে যাচ্ছে না ‘র’। তিনি আরও বলেন, ‘প্রক্সির’ সহযোগিতা নিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে সংস্থাটি। আর এ কারণে অভিযোগ উঠলে তা অস্বীকারের সুযোগ পায় ভারত।

এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে গোপনে কার্যক্রম চালানোর প্রয়োজন বোধ করে না দিল্লি। কারণ, অনেক দেশের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় প্রত্যর্পণ এবং নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগের মতো লক্ষ্যগুলো পূরণ হয়ে যায়।

লেভি মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বে কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে ‘র’ খুব সতর্ক। ইউরোপ থেকে অন্যান্য জায়গায় নগদ অর্থ, অস্ত্র এবং মানুষকে সরানোর ব্যবস্থা করতে পারে ‘র’। দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেই তারা মূলত সরাসরি পদক্ষেপ নিয়ে থাকে।

রাজনৈতিক সমর্থন

গোপনে মধ্য দিল্লির একটি ড্র্যাব অফিস কমপ্লেক্স থেকে কাজ করে আসছে ‘র’। রয়টার্স এই সংস্থার বাজেট এবং সাইজ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা করতে পারেনি।

২০০৮ সালের ইউএস কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের একটি রিপোর্ট অনুসারে, এটি ১৯৬৮ সালে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং ১৯৬২ সালে প্রায় একমাস স্থায়ী হওয়া চীন-ভারত যুদ্ধের পর থেকে দেশটির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার দায়িত্ব পায় ‘র’। এমনকি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইসরায়েলের মোসাদ এবং সিআইএর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ‘র’-এর।

‘র’-এর অবসরপ্রাপ্ত একজন এবং বর্তমান দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ভারতে নরেন্দ্র মোদির আগের সরকারগুলো গোয়েন্দা সংস্থাটিকে খুব একটা পৃষ্ঠপোষকতা দেয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাবিষয়ক বইয়ের সহলেখক আড্রিয়ান লেভি বলেন, মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কিন্তু যেহেতু ভারতীয় গোয়েন্দা পরিষেবাগুলো আরও বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং অনেক বেশি ছড়িয়ে গেছে, তারা যে আইনি কাঠামোতে কাজ করে তা আধুনিক গণতন্ত্রগুলো কীভাবে গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করে তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি বলেও মনে করেন তিনি।

এক সরকারি আদেশের অধীনে জন্ম হয়েছিল ‘র’-এর যার কোনো আনুষ্ঠানিক সংসদীয় বা সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। লেভি মনে করেন, এর মানে হলো সংস্থাটিকে খুব একটা আইনি জটিলতার মধ্যে যেতে হয়নি। এর ওপর নজরদারিও হয়েছে কম। মূলত, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনে কেন্দ্রীয়ভাবেই এটি নিয়ন্ত্রিত হয়।

ইত্তেফাক/এসএটি