বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ ঢাকা শহরের নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। মাঠ ও পার্কের সংখ্যা কমছে। দিন দিন সবুজ বিলীন হচ্ছে। জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হচ্ছে। এডিস মশার কামড়ে তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। ফুটপাতের পরিসর সীমিত হচ্ছে। যানজটে পড়ে কোটি কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। গণপরিবহনগুলোও নারী, বৃদ্ধ ও শিশুবান্ধব নয়! যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা। রয়েছে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি। জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। তবু মানুষ ঢাকা শহরে ছুটছে। কীসের আশায়? ভালো চিকিত্সা, ভালো শিক্ষা, কর্মসংস্থান এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক।
লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এ প্রকাশিত দ্য গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৩ (বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচক)-এর প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ১৭৩টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৬৬ নম্বরে (নিচের দিক দিয়ে সপ্তম)। গত ১০ বছরের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ঢাকার অবস্থান বিশ্বের বাসযোগ্যহীন শহরের মধ্যে ওপরের সারিতে। ঢাকা শহরের অর্ধেকের বেশি ভবন ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে এই শহরে পানি পাওয়া কঠিন। কেননা জলাশয়গুলো ক্রমেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ঢাকা শহরের চলাচলরত ৪০ শতাংশ গাড়ির কোনো ফিটনেস নেই। নগরের ভরাট খালগুলো উদ্ধার করা গেলে মশার যন্ত্রণা অনেকটাই কমে আসত। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে পূর্ণাঙ্গ ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়নি গত দুই দশকেও। নিষিদ্ধ পলিথিনের জয়জয়কার ঢাকা শহরে।
ঢাকা শহরে জলাশয় কমছে, কমছে সবুজ। তাপমাত্রা বাড়ছে। ১৯৭৪ সালে প্রথম আদমশুমারিতে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৬ লাখের মতো। বর্তমানে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এ শহরে ৪৯ হাজার মানুষের বসবাস। ঢাকামুখী জনস্রোত অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৩ কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। রাজধানী ঢাকা শহরকে ঘিরে বড় বড় প্রকল্প ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেসব প্রকল্প ও উন্নয়নের অর্থ পরিকল্পনামাফিক ব্যয় করা হয় না। ফলে সাময়িক সুফল পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল মেলে না। আবার এটাও ঠিক ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে না পারলে যে কোনো শহর বাসযোগ্য করা কঠিন। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকা শহরে ভিড় জমাচ্ছে। ধারণা করা যায়, জলবায়ুগত সমস্যা আগামী দিনগুলোতে আরো তীব্র হবে। তাই কার্যকর ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। জলাবদ্ধতা, সবুজ কমে যাওয়া, যানজট, বায়ুদূষণ, ডেঙ্গুতে মৃত্যু—এগুলো পুরোনো সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানের পথ নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। ড্যাপ বাস্তবায়ন নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি! সবাই ঢাকা শহর থেকে সুবিধা নিতে চাই; কিন্তু ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা নিয়ে খুব কমই চিন্তা করা হয়। বিকেন্দ্রীকরণ করলে ঢাকা শহরের সমস্যা অর্ধেক মিটে যাবে।
শিক্ষা, চিকিত্সা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানসহ সবকিছুর কেন্দ্রস্থল কেন ঢাকা হবে? সব মন্ত্রণালয় ঢাকায় কেন রাখতে হবে? ঢাকার আশপাশের জেলা তথা নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ কিংবা বিভাগীয় শহরে কিছু মন্ত্রণালয় রাখা যেতে পারে। ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করতে হলে প্রধান কাজ হলো জনসংখ্যা কমানো। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে ঢাকা শহরের চাপ অনেকটাই কমে যাবে।
লেখক: শিক্ষক, লৌহজং বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জ
