‘দিন শেষে কিশোর অপরাধীরাও ঘরে ফিরে আসে’

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৩০

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে ‘কিশোর গ্যাং’য়ের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ‘কিশোর গ্যাং’ নামকরণ কীভাবে হয়েছে, সেটা আমাদের জানা নেই। কিন্তু ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়। কারণ ‘গ্যাং’ শব্দটি সব সময়ই নিগেটিভ অর্থে ব্যবহূত হয়। কিশোর দল বলা হলে তা ইতিবাচক শোনায়, কিন্তু ‘কিশোর গ্যাং’ আমাদের মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়। ‘কিশোর গ্যাং’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই এমন এক দল কিশোরের ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যারা দলগতভাবে স্কুল-কলেজের গেটের সামনে আড্ডা দেয়, মহল্লার গলির মোড়ে দল বেঁধে অবস্থান করে। অথবা একাধিক বন্ধু মিলে দুরন্ত গতিতে অস্বাভাবিক উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে যায়, যারা কোনো কিছুকেই পরোয়া করে না। কিশোর অপরাধ আর বড়দের অপরাধের মধ্যে কোনো তফাত নেই। দুটিই অপরাধ। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষ অপরাধ করলে তাকে কঠোর দৃষ্টিতে দেখা হয়। তার জন্য প্রচলিত আইনে উপযুক্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। একজন কিশোর অপরাধ করলে তাকে অনেকটা নমনীয় দৃষ্টিতে দেখা হয়, শাস্তিও তুলনামূলক কম। যেমন—একজন মানুষ কাউকে খুন করল। খুনির বয়স যদি ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে হয়, তাহলে তার অপরাধের বিচার হবে প্যানাল কোর্টে। আর একই অপরাধ যদি একজন কিশোর সংঘটিত করে, তাহলে তার বিচার হবে শিশু কোর্টে। কিন্তু দুটি অপরাধ একই ধরনের বা নেচারের হলেও কিশোর অপরাধীর বিচার হবে ভিন্ন কোর্টে।

সমাজে ‘কিশোর গ্যাং’ কীভাবে সৃষ্ট হলো বা ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার কীভাবে গড়ে উঠল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ‘কিশোর গ্যাং’ কি এমনি এমনি গড়ে ওঠে, নাকি এর পেছনে কেউ বা কোনো মহল থেকে কলকাঠি নাড়ায়? বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বিষয়টি বিবেচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, দেশে লাখ লাখ কিশোর রয়েছে, যাদের ঘরে খাবার নেই। পরনে কাপড় নেই। যারা নিত্যদিন অভাব-অনটনের সঙ্গে সংগ্রাম করে অনাদর-অবহেলায় বড় হচ্ছে। তাদের পরিবারের কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই। তারা আশপাশে বিত্তবান পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করে। ফলে তাদের মনে একধরনের হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। না পাওয়ার বেদনা ও ক্ষোভ থেকে তাদের মনে আক্রোশ জন্মায়। তারা নানা ধরনের অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তাদের অপরাধকর্মে যুক্ত হওয়ার পেছনে মূলত আর্থিক ব্যাপারটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এছাড়া অন্যদের দেখিয়ে দেওয়ার মতো একধরনের প্রবণতাও তাদের মধ্যে থাকে। শিশুদের মধ্যে একধরনের অ্যাডভেন্সারিজম কাজ করে। তারা যে কোনো মূল্যেই হোক, অর্থ উপার্জনের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের কাছে তখন নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নটি গৌণ হয়ে যায়। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অধিকাংশই অল্প বয়সেই বিভিন্ন কারখানা-ওয়ার্কশপে কাজ করতে বাধ্য হয়। কর্মক্ষেত্রে তারা অপমানিত-লাঞ্ছিত হয়। তার পরও উপযুক্ত মজুরি পায় না। এই না পাওয়ার বেদনা তাদের অপরাধকর্মে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই সুযোগই গ্রহণ করে একশ্রেণির স্থানীয় ব্যক্তি, যাদের অধিকাংশই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা। তারা কিশোরদের দিয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এমনকি রাজনৈতিক সংঘাত-বিবাদেও তাদের কাজে লাগায়। এভাবে তারা এক ভিন্ন জগতে পা রাখতে শুরু করে। এমন কোনো অপরাধকর্ম নেই, যা এসব কিশোরকে দিয়ে করানো হয় না। এভাবে একটি দরিদ্র ও নিঃস্ব কিশোরও একসময় বেশ ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ভাবতে থাকে। কেউ কেউ কিশোরদের দিয়ে মাদক বহন করান, অস্ত্র বহন করান। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যারা কিশোরদের রাজনৈতিক অন্যায় কর্মের জন্য ব্যবহার করছেন, তারা কি তাদের কিশোর নাতি অথবা ছেলেকে মিছিলে নিয়ে আসবেন? কখনোই না। কারণ  তাদের সন্তান তো বিদেশে লেখাপড়া করে। মিছিল-মিটিংয়ে গিয়ে কিশোরদের অনেকেই মারা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো নেতা বা নেত্রীর ছেলেমেয়ে বা নাতি কি মিছিলে গিয়ে কখনোই গুলিবিদ্ধ হয়ে বা অন্য কোনোভাবে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে? পোস্টার লাগনোর জন্যও কিশোরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মিটিং-মিছিলে লোকসমাগম বাড়ানোর জন্য কিশোরদের ডাকা হয়। এই কিশোর কারা? এই কিশোর প্রধানত তারাই, যাদের ঘরে তিন বেলা খাবারের সংস্থান থাকে না। তাদের সামান্য কিছু খাবার এবং টাকা দিলেও যে কোনো অপকর্ম করানো যায়। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে মাদকের ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব নেতা কিশোরদের মাদক বহনের জন্য ব্যবহার করেন। মাদক বহন করে একজন কিশোর বেশ ভালো অর্থ উপার্জন করতে পারে। এক সময় সে নিজেই মাদকের ব্যবসা শুরু করে। বাজারে যদি মাদক না পাওয়া যেত বা অস্ত্র বেচাকেনা না হতো, তাহলে তো কিশোর ছেলেটির এই কাজে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না। কাজেই রাষ্ট্রের এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি মাদক নির্মূল করা যেত, কিশোরদের মাদক বহনের কাজে ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকত না। একটি কিশোর ছেলে তার নিজের ঘর থেকে মাদক নিয়ে বের হয় না। বরং সে বাইরে থেকে মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে ঘরে ফেরে। সমাজকে মাদকমুক্ত, অস্ত্রমুক্ত করার দায়িত্ব কার? এটা নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র কি সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে? মাদক কীভাবে মিয়ানমার থেকে কোন পথে আসে, আমাদের কর্তাব্যক্তিরা তা জানেন। জানেন যদি, তাহলে তা প্রতিরোধ বা নির্মূল করা হচ্ছে না কোন? একটি ছেলে যদি ঘর থেকে কোনো কারণে রাগ বা অভিমান করে বেরিয়ে যায়, তাহলে তার আশ্রয় জোটে রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় অথবা কোনো বড় ভাইয়ের দপ্তরে। নেতারা কি কখনো কিশোরদের ভালো পথে চলার জন্য শাসন করেন? তারা বরং তাদের উত্সাহিত করেন কীভাবে তারা অন্যায়-অপকর্মে যুক্ত হতে পারে। কোনো কিশোর ঘর থেকে অপরাধী হয়ে বাইরে যায় না। বরং বাইরে থেকে অপরাধী হয়ে ঘরে ফেরে। কাজেই আমাদের বাইরের পরিবেশটা যাতে ভালো থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে কিশোরদের অপরাধকর্মে নিয়োজিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। আপনি সমাজে মাদকের অবাধ বিচরণ করতে দেবেন আর কাউকে বলবেন আপনি মাদক স্পর্শ করবেন না, তা কি হয়? আপনি বাজারে অবৈধ অর্থের ছড়াছড়ি চলতে দেবেন আর কাউকে বলবেন, তুমি অবৈধ অর্থ স্পর্শ করবে না, তা কি হয়। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ একজন ক্ষুধার্ত কিশোরের সামনে যদি লোভনীয় খাদ্যের উপস্থিতি ঘটে, তাহলে সে তো খাবারের পাত্রে হাত দেবেই। কাজেই কিশোর অপরাধ দমন করতে হলে সমাজকে আগে পরিষ্কার ও কলুষমুক্ত করতে হবে।  

এখানে অবশ্য পরিবারেরও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। একটি কিশোর ছেলে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেলামেশা করে—এসব বিষয় পরিবারের তরফ থেকে ভালোভাবে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ছেলেমেয়েদের জন্য অভিভাবকদের সময় দেওয়া প্রয়োজন। তাদের সুবিধা-অসুবিধা জানতে চাওয়া উচিত। সারা দিনের ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের পর পাখি যেমন ঘরে ফেরে, ঠিক তেমনি কোনো কিশোর ছেলে সারা দিন যার সঙ্গেই মেলামেশা করুক, যেখানেই যাক না কেন, দিন শেষে বাড়ি ফিরে আসবেই। বাবা-মা যদি সন্তানের গতিবিধি লক্ষ করেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন সে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মেলামেশা করছে। কিশোরদের খেলাধুলা ও বিনোদনের স্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। তারা চাইলেই খেলাধুলা করতে পারছে না।

কিশোর অপরাধ দমন করতে চাইলে প্রথমেই সামজকে দুর্নীতি ও অনাচারমুক্ত করতে হবে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর কেউ যাতে তাদের ব্যক্তিস্বার্থে নির্মল কিশোরদের ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। আজকে যারা কিশোর, ভবিষ্যতে তারাই দেশের কর্ণধার হবে। কাজেই তারা যাতে কোনোভাবেই বিপথগামী না হয়, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আজকের কিশোর ছেলেটি যদি বিপথগামী হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশ উপযুক্ত নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

লেখক :সিনিয়র অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলা ফাউন্ডেশন

অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এমএএম