সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রাতভর নির্যাতনে রায়হান আহমদ (৩৪) নামের যুবককে নির্মমভাবে হত্যার তিন বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে বুধবার (১১ অক্টোবর)। ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে এসএমপির কোতোয়ালি থানার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হানকে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করা হলে পরদিন ১১ অক্টোবর সকালে তিনি মারা যান।
বহুল আলোচিত এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের কথা ১২ অক্টোবর। গত তিন বছরে এ পর্যন্ত ৫৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রীর করা মামলায় পুলিশের একটি অনুসন্ধানী কমিটি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনার সত্যতা খুঁজে পায়। ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পলাতক এসআই আকবরকে ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পিবিআই। অভিযোগপত্রে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে (৩২) প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন সহকারী উপ-পরিদর্শক আশেক এলাহী (৪৩), কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদ (৩২), টিটু চন্দ্র দাস (৩৮), সাময়িক বরখাস্ত এসআই মো. হাসান উদ্দিন (৩২) ও এসআই আকবরের আত্মীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমান (৩২)।
গত বছরের ১৮ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এদিকে গত তিন বছরে ৬৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৬ জন তাদের সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে রায়হানের মা সালমা বেগম ও স্ত্রী তাহমিনা আক্তারও সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ৭ সেপ্টেম্বর সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৩ এর বিচারক শারমিন খানমের আদালতে মামলায় সর্বশেষ সাক্ষ্য দিয়েছেন।
কাল ১২ অক্টোবর আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেন, মুহিদুল ইসলাম ও সিলেট কোতোয়ালি থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক আবদুল বাতেন এবং সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র জানায়, এ মামলায় অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্য উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে রয়েছে। তবে অভিযুক্ত আবদুলল্লাহ আল নোমান এখনো পলাতক। বাকি চার আসামি জেল হাজতে। আবদুলল্লাহ আল নোমানের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মালামাল ক্রোকের আদেশ করেছে পুলিশ।
নিহতের মা সালমা বেগম বলেন, রায়হানের মৃত্যুর মাত্র ১৫ মাস আগে বিয়ে হয়। মারা যাওয়ার দুই মাস আগে তার একমাত্র মেয়ের জন্ম হয়। নাতনি আলফা আক্তারের বয়স এখন তিন বছর। মেয়েটি বাবার আদর ছাড়াই বড় হচ্ছে। সে কোনোদিন বাবা ডাকতে পারবে না। এমন চিন্তায় বুক ফেটে যায়।
সালমা বেগম বলেন, আসামিরা সাক্ষ্য গ্রহণের আগে মামলা আপস করতে ৫০ লাখ টাকার লোভ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা টাকা চাইনা। দোষীদের শাস্তি চাই। আশা করছি, আমরা ন্যায়বিচার পাব। সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।
চাঞ্চল্যকর এ মামলার প্রধান অভিযুক্ত সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়া তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে গত ১০ সেপ্টেম্বর ব্যক্তিগত অসুস্থতা দেখিয়ে আদালতে হাজিরা থেকে অব্যাহতির পিটিশন দাখিল করেছেন।
আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এমএ ফজল চৌধুরী বলেন, মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন হবে। বিচার শেষে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।
