রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর ইসির

তপসিল ঘোষণার পথে হাঁটছে কমিশন

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:০০

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি মাস শেষেই রাজনৈতিক গতিবিধি স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তপসিল ঘোষণার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভোট হতে পারে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)সহ অন্যদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে।

ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিতে বর্তমানে যে দ্বিধাবিভক্ত আছে সেটি কোন দিকে মোড় নেবে তা আগামী নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে জানা যাবে। সব দল অংশগ্রহণ করলে নির্বাচন পরিস্থিতি হবে এক রকম, আর বিরোধী পক্ষ বর্জন করলে হবে আরেক রকম পরিস্থিতি। সেই অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।

সাংবাবিধানিকভাবে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সেক্ষেত্রে ১ নভেম্বর শুরু হবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা। ২ নভেম্বর আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে ইসি। আগামী ৫ নভেম্বর দুটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন সম্পন্নের পরপরই তপসিল ঘোষণা করা হবে।  আসন্ন দ্বাদশ সংসদের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন দলসহ একপক্ষ চাচ্ছে সংবিধান অনুযায়ী ভোট করতে। অন্যদিকে বিএনপিসহ আরেকটি পক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় ভোটে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করবে কি না বা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হবে কি না—সেদিকে দৃষ্টি রেখেছে ইসি। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনি প্রতিনিধিদলকে ইসি থেকে জানানো হয়, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংলাপের আয়োজন করলেও কিছু দল তা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল নিয়ে আপাতত আর সংলাপের সুযোগ নেই। তবে কোনো রাজনৈতিক দল চাইলে নির্বাচন কমিশনে এসে তাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

আগামী নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেছেন, যেভাবেই হোক না কেন নির্বাচন হতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের জানুয়ারির ২৯ তারিখের মধ্যে যেভাবেই হোক না কেন নির্বাচন হতে হবে। কারণ, তা না হলে একটি সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে। সেই গ্যাপ তৈরি হলে দেশে একটা অরাজকতা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। 

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, আমরা কাউকে জোর করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে পারব না। শুরু থেকেই সব রাজনৈতিক দলকে আমরা আহ্বান করেছিলাম। আমরা সংলাপে বসেছিলাম। কেউ কেউ আমাদের সংলাপে আসেনি। কেউ কেউ আমাদের এখনো মানেনি। আমরা তাদের বারবার পত্র দিয়ে আহ্বান জানিয়েছি। আমরা আহ্বান সব সময় করে যাচ্ছি। আমাদের দরজা তাদের জন্য সব সময় খোলা। সবার সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি আছি। আমাদের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে ডেকে সংলাপ করার মতো সময় নেই।

নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথা অনুযায়ী ভোটের তারিখের আগে ৪৫-৬০ দিন সময় রেখে তপসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রত্যাহারের সময় ও প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচারের জন্য সময় রাখা হয়। প্রচারণার জন্যে সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ। 

ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের তপসিল ঘোষণার জন্য ইসির হাতে সময় আছে মাত্র এক মাসেরও কম সময়। তপসিল ঘোষণার আগে যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় সেরে ফেলেছে ইসি। জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে তপসিল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তার আগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করবেন হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন। মাঠ পর্যায়ে প্রিজাইডিং অফিসারদের তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে। চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১০৩টি। ভোটকক্ষের সংখ্যা ২ লাখ ৬১ হাজার ৯১৪টি। নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কাজও শেষ হয়েছে। পর্যবেক্ষক নিবন্ধন প্রাথমিক ধাপ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও কিছু পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষণ নীতিমালাও চূড়ান্ত হয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলমান। একই সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহে মোটরসাইকেলের অনুমতি দিয়ে সাংবাদিক নীতিমালাও সংশোধন করা হয়েছে। 

ইসি সূত্র জানায়, বিগত একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। এবার কাগজসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যয় দ্বিগুণ হতে পারে। এক্ষেত্রে নির্বাচনের জন্য ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্স, নির্বাচনি সামগ্রী, প্রশিক্ষণ, পরিবহন, জ্বালানিসহ নির্বাচন পরিচালনায় অন্তত ৬০-৭০টি খাত থাকবে; যেগুলোয় এ টাকা ব্যয় হবে। তবে এর বড় একটি অংশ ব্যয় হবে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলে বাধাদান ঠেকাতে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ই-ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে জামানতের টাকা পরিশোধের সুযোগও থাকবে। অন্যদিকে ভোটকেন্দ্রের নাম ও ভোটার নম্বর খুঁজে পাওয়ার ভোগান্তি কমাতে ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যাপ’ নামে একটি অ্যাপ তৈরি করছে কমিশন।

ইত্তেফাক/এমএএম