তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন রাবি শিক্ষার্থী আয়াতুল্লাহ 

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৩, ১৩:১৭

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই  ভ্রমণের চিন্তা আসে তার। তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই ২০১৮ সালে বেরিয়ে পড়েন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে। ১ম জেলা ভ্রমণেই টাকার স্বল্পতায় ৫ বেলা না খেয়ে এবং রেলস্টেশনে রাত কাটিয়েছেন তিনি। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই ভ্রমণ শুরু এবং ২০২২ সালের শেষের দিকে নেত্রকোনা জেলা ভ্রমণের মাধ্যমে দেশের  ৬৪ জেলা ভ্রমণ শেষ করেন তিনি। 

মুহাম্মাদ আয়াতুল্লাহ ঝালকাঠি জেলা সদরের বাসিন্দা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে এম.ফিল/পিএইচডি এর জন্য পরীক্ষা দিয়েছেন।

দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে ভ্রমণ বিষয়ে আলাপ হয় আয়াতুল্লাহর। তিনি বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত। বিভিন্ন সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, মানুষের আচার-আচরণ, বিভিন্ন জেলার মানুষের বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদি জানতে ও শিখতে আমি সবসময় উৎসুক। আমি পুরো দেশকে  জানতে চেয়েছিলাম, দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় যেতে চাচ্ছিলাম। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শত-শত পুরাতন ঐতিহাসিক স্থাপনা। এগুলো দেখাই ছিল আমার মূল লক্ষ্য।

সারা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ৭ জন মহান বীরশ্রেষ্ঠের সমাধির মধ্যে ৬ জন বীরশ্রেষ্ঠের সমাধিতে গিয়েছি। এটা আমার নিকট একটি বড় অর্জন। আমি রেলস্টেশনে ঘুমিয়েছি, আমি লঞ্চঘাটে ঘুমিয়েছি, মসজিদে ঘুমিয়েছি, রাস্তার পাশে তাবু করে ঘুমিয়েছি, ৫০ টাকার হোটেলে থেকেছি, বান্দরবানে আদিবাসী/উপজাতিদের ঘরে ঘুমিয়েছি। উপজাতিদের জুম ঘরে থেকেছি, জ্যান্ত কাঁকড়া খেয়েছি, ব্যাঙের ভর্তা খেয়েছি, আধা কাঁচা মুরগি রান্না করা খেয়েছি, কখনো কখনো আর্থিক সমস্যার কারণে ৩ বেলাই না খেয়ে থেকেছি। 

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় পাহাড়ে যাওয়ার  জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা হেঁটেছি না খেয়ে। এমনকি কখনো কখনো গভীর রাতে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে পাহাড়ে হেঁটেছি, যা ছিল ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এই পাহাড়গুলোতে যাওয়ার জন্য বুক সমান পানির মধ্যে হেঁটেছি। আর খারাপ অভিজ্ঞতা হল- আমি দুই বার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছি, যে সময় ছিনতাইকারীরা আমাকে লুট করেছিলে।

তার ভ্রমণ নিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পরিবার এ বিষয়ে কিছুই জানতো না। কারণ তারা এগুলো সমর্থন বা পছন্দ করে না। ৬৪ জেলায় ভ্রমন সম্পন্ন হওয়ার পর তারা জেনেছে। বন্ধুরা ও বড় ভাইয়েরা সবসময় উৎসাহ দিয়েছে। ভ্রমন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই/বোন বা ছোট ভাই/বোনদের বাসায় থেকেছি। তাদের মধ্যে অনেকে এমনও আছে, যাদের নিকট থেকে আমি ধার করে এই ভ্রমন সম্পন্ন করেছি।

ভ্রমনের টাকার উৎস জানতে চাইলে তিনি জানান, বাসা থেকে ভ্রমনের জন্য আমি কোনদিন টাকা নেইনি। প্রতি মাসের হাতখরচ থেকে টাকা জমিয়ে কয়েকমাস পর পর ভ্রমণে বের হতাম এবং এই কারণে আমার ভ্রমন শেষ করতে এতো বেশি সময় লেগেছে।

তাকে বিমোহিত করেছে এমন স্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সৌন্দর্যের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো লাগার স্থান হল বান্দরবন। আমার কাছে একটি স্বপ্নের মতো জায়গা। আমিয়াখুম ও নাফাখুম ঝর্নায় যাওয়াটা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। তার পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে বড় পাহাড় তাজিংডং বিজয় করাটা আমার স্মৃতির মানসপটে ভাসছে। বান্দরবানের পরে মৌলভীবাজার ভালো লেগেছে। এ জেলায় প্রবেশ করা মাত্রই চা এর ঘ্রানে আমি বিমোহিত হয়েছিলাম। তার পাশাপাশি মৌলভিবাজারের হামহাম জলপ্রপাত এখনও আমার চোখে ভাসে। মৌলভীবাজারের পরে ভালো লেগেছে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের রাত্রিটা। তারপরে ভালো লেগেছে 'মেঘের বাড়ি' রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি এবং কক্সবাজাররের সেন্টমার্টিন।

এসময় তিনি কিছু সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। এগুলো হল: সন্তানকে শিক্ষার দানের গুরুত্ব, মাদকের ভয়াবহতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব, পরিবেশ সচেতনতার ব্যাপারে গুরুত্ব, ভ্রমনের গুরুত্ব ও শিশু শ্রম বন্ধকরণ।

তার ভ্রমনের মাধ্যম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, বাংলাদেশের একমাত্র প্লেন বাদে সব পরিবহনে আমি  ভ্রমন করেছি। যেমন: লোকাল বাস, ট্রেন, রিক্সা, টেম্পু মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, নৌকা, লঞ্চসহ ইত্যাদি। 

ভ্রমনের এই তীব্র ইচ্ছা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমার সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশকে জানতে চেয়েছিলাম, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আরো গভীরভাবে জানতে চেয়েছিলাম, দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো নিজ চোখে দেখতে চেয়েছিলাম কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো একটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। এই সকল কিছু মিলিয়েই আমার ৬৪ জেলা ভ্রমণের আগ্রহ জন্মে।

ইত্তেফাক/এআই