সংবিধানের মূলনীতির সাক্ষী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৩, ১১:২২

দেশের প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে। যা শিক্ষার্থীদের ৫২'র ভাষা আন্দোলনে বাঙালিদের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। কাঠামোগত দিক থেকে স্কুল কলেজ পর্যায়ে সকল শহীদ মিনার প্রায় একই ধরনের।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শহীদ মিনারের কাঠামোতে রয়েছে বৈচিত্র্যতা। তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারও অন্য সকল স্কুল, কলেজ, প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার থেকে আলাদা। ছয় কোণা প্ল্যাটফর্মের ওপর লম্বা চারটি স্তম্ভ দিয়ে তৈরি শহীদ মিনারটি। যা প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। 

১৯৭২ সালে যখন আমাদের সংবিধান গঠিত হয়েছিল তখন থেকেই সংবিধানে ৪ টি মূলনীতি রয়েছে। যা ওই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর অর্থাৎ বিজয় দিবসের প্রথম বার্ষিকী হতে কার্যকর আছে। আর তার প্রধান চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার।

মিনারের চারটি বাহু সংবিধানের চারটি মূলনীতির ইঙ্গিত বহন করে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সুলতান-উল-ইসলাম। যার নকশা করেন স্থপতি খায়রুল এনাম।


১৯৭২ সালের ৯ মে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণ কাজ শেষ হলে ১৯৭৫ সালের ২৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলী এর উদ্বোধন করেন।

এ শহীদ মিনারে রয়েছে চারটি বাহু যা উল্লম্বভাবে উঠে গেছে উপরের দিকে। বাহু চারটি উপরের দিকে বন্ধনী দ্বারা আবদ্ধ। এর প্ল্যাটফর্মটি কৃত্রিমভাবে তৈরি মাটির টিলার ওপর অবস্থিত। ফলে বেশ কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় শহীদ মিনারের মূল ভিত্তিতে। শহীদ মিনারটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এর ম্যুরাল চিত্র, শহীদস্মৃতি সংগ্রহশালা, উন্মুক্ত মঞ্চ, সুবিস্তৃত খোলা প্রান্তর এবং ফুলর বাগান। আর এসব কিছুর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে অনন্য এই শহীদ মিনার চত্বর।

এক স্নেহময়ী মা ও তার সন্তানদের অবয়ব প্রকাশ করছে এমন একটি ম্যুরাল চিত্র রয়েছে মিনারের পেছনের দিকে। অক্ষয়বট শীর্ষক ম্যুরালটি নানা বর্ণের পোড়া ইট ও পাথরের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়। ম্যুরালটি সূর্যের উপস্থিতিতে শহীদ সন্তানদের বীরত্বকে উপস্থাপন করে। এছাড়া মায়ের অঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসার বিষয়টিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেখানে। গঠনশৈলী এবং উপাদানের বৈচিত্র্যে অনন্য এ ম্যুরালটি নির্মাণ করেছেন শিল্পী মর্তুজা বশীর।

এদিকে, শহীদ মিনারের পাদদেশে যেদিক থেকে সূর্য উদয় হয় সেদিকে রয়েছে একটি শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা। এ সংগ্রহশালার ডিজাইন করেন স্থপতি মাহবুবুল হক। সংগ্রহশালায় রয়েছে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের নানা রাজনৈতিক ঘটনাবলির আলোকচিত্র, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নানা শিল্পকর্ম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের আলোকচিত্র, তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র।

এই সংগ্রহশালার কোল ঘেঁষে রয়েছে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। এর পেছনের দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গ্রাম বাংলার আবহমান দৃশ্য। এটি নির্মাণ করেন শিল্পী ফণীন্দ্রনাথ রায়। এ মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- যার মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণের ধারা। সর্বোপরি ক্যাম্পাসে আসা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে শহীদ মিনার চত্বর।

সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শহীদ মিনারে দেখা যায় দর্শনার্থীদের উপচে পরা ভিড়। পরিবার, বন্ধু কেউ ঘুরতে নিয়ে আসেন নিজের প্রিয় মানুষটিকে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস দেখতে আসলে শহীদ মিনারেই কাটিয়ে দেন আংশিক সময়। 


বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী জয়নাল আবেদীন। তার পরিবারকে নিয়ে এসেছেন শহীদ মিনার দেখাতে৷ এখানে তাদের অনেক সৃতি জমে আছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, এই শহীদ মিনারে আমাদের অনেক সৃতি! বিকালে আমরা প্রায়ই এই চত্ত্বরে বসে আড্ডা দিতাম। এখানে আমরা গ্রুপ স্টাডিও করতাম। এখন কাজের ফাকে ছুটি পেলেই চলে আসি পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে। এখানে কাটানো আগের দিনগুলো এখন খুব মনে পরে৷ 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ। তার বাবা ক্যাম্পাস দেখতে এসেছেন। নিজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার চত্ত্বরে বাবাকে ছবি তুলে দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, এই শহীদ মিনার চত্ত্বর আমার খুব প্রিয়। তাই বাবাকে প্রথমে এখানেই নিয়ে আসলাম। ছবি তুলে দিচ্ছি। বাড়িতে গিয়ে মা আর ছোট বোনকে দেখাবে। তারা তো এ-তো সুন্দর শহীদ মিনার কখনো দেখেনি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সুলতান-উল-ইসলাম জানান, পাকিস্তানিদের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্নসহ বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ করে আছে এ সংগ্রহশালা। শুধু মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে ধারণ নয় তার চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে সবার মাঝে।

ইত্তেফাক/এআই