মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

শিশু ফুটবলার ধর্ষণচেষ্টা

সেই অভিযুক্ত আলেফ শেখের জামিন বাতিল, তদন্ত চলছে আইনজীবীর বিরুদ্ধে

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ২২:৫৭

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে শিশু ফুটবলার ধর্ষণ অপচেষ্টা মামলার সেই আসামি আলেফ শেখের জামিন বাতিল হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত চীপ জুডিশিডিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মাহমুদুল মহসীন ভিক্টিম ও বাদীর নিরাপত্তার স্বার্থে আগের জামিন বাতিল করে আসামিকে জেলহাজতে পাঠান। বাদীপক্ষের আইনজীবী আইনজীবী এপিপি মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন।

জানা যায়, টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের উড়িয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী এবং শিশু ফুটবলার গত ২৪ জুলাই ধর্ষণ অপচেষ্টার শিকার হন। একই দিন গোপালপুর থানায় একটি ধর্ষণ অপচেষ্টা মামলা হয়। পুলিশ উড়িয়াবাড়ী গ্রামের ব্যবসায়ী আলেফ শেখকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। 

গত ২২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়ে রাত নয়টায় আসামি আলেফ খান এবং তার আইনজীবী রবিউল হাসান রতন ব্যান্ডপার্টি নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন। তারপর আলেফ শেখ গলায় ফুলের মালা জড়িয়ে কয়েকজন আত্মীয়স্বজন এবং ওই আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে সারা উড়িয়াবাড়ী গ্রাম নেচেগেয়ে উন্মাতাল করেন। একপর্যায়ে ভিক্টিমের বাড়িয়ে গিয়ে বাদীকে মামলা তুলে নেওয়ার নির্দেশ অন্যথায় প্রাণনাশের হুমকি দেন। এমতাবস্থায় বাদী এবং ভিক্টিমের মা রেজিয়া বেগম গত ২৬ আগস্ট জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গোপালপুর থানায় জিডি করেন। 

গোপালপুর থানার হেমনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই মঞ্জুর আহমেদ তদন্তে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পেয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর পেনাল কোডের ৫০৬ ধারায় আসামি আলেফ শেখের বিরুদ্ধে আদালতে  প্রসিকিউশন দাখিল করেন। 

অপরদিকে ভিক্টিমের জবানবন্দী এবং সাক্ষ্য প্রমাণে ধর্ষণ অপচেষ্টার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ৯(৪)(খ) ধারায় আসামি আলেফ খানের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন হেমনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সাবইন্সপেক্টর বশীর আহমেদ। 

এদিকে ভিক্টিমের মা এবং মামলার বাদী রেজিয়া বেগম গত ২৮ আগস্ট গোপালপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগে জানান যে, মামলায় জামিনের পর অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান রতন তিন হাজার চারশ টাকায় ব্যান্ডপার্টি ভাড়া করে আলেফ শেখকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে আসেন। বাদ্যবাজনার সময় ওই আইনজীবী নিজে উপস্থিত ছিলেন। এমন কি তার সামনেই ভিক্টিম ও বাদীকে আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। অ্যাডভোকেট রতনের বাড়িও একই গ্রামে এবং তিনি উড়িয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। গত জানুয়ারি মাসে মেধাবী শিক্ষার্থী এবং কৃতি শিশু ফুটবলার হিসাবে ভিক্টিমকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিনামূল্যের পাঠ্য বই তুলে দেন। নিজ স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থী এবং পুরস্কার প্রাপ্ত একজন কৃতি শিশু ফুটবলার ধর্ষণ অপচেষ্টার শিকার হলেও সেই মুষড়েপড়া শিশুটির কোনো খোঁজ নেননি তিনি। উপরন্তু ধর্ষণ অপচেষ্টা মামলার আসামিকে জামিন করিয়ে ব্যান্ডপার্টি নিয়ে আসামিদের সঙ্গে নাচগানের মাধ্যমে যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তা নজিরবিহীন ঘটনা। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির এমন অপকাণ্ডে ভিক্টিম স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট রবিউল হাসান রতনকে সভাপতির পদ থেকে অপসারনের দাবি জানান তিনি। এমতাবস্থায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবুল কালাম উড়িয়াবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ভিক্টিম ও তার বাবামার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি ওই আইনজীবীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পান। স্কুলের মিটিংয়ে ওই আইনজীবীর এমন অমানবিক ভূমিকার নিন্দা জানান সবাই। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদ থেকে তাকে বিরত রাখার মৌখিক নির্দেশ দেন। এমন কি গত ২১ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিস ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক কাজের দরুন বিবাদীর আইনজীবী রবিইল হাসান রতনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কাছে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠান। 

জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানান, অ্যাডভোকেট রতনের বিরুদ্ধে মামলার বাদীর আনা এমন অভিযোগের বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য টাঙ্গাইল জেলা আইনজীবি সমিতিকে পত্র দেওয়া হয়েছে। 

বাদীর আইনজীবী এপিপি মোহাম্মদ জুয়েল মিয়া জানান, আইনজীবী রবিউল হাসান রতনের বিরুদ্ধে বাদীর অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী সমিতি কাজ করছে। এটি সমিতির একটি অভ্যন্তরীণ বিচার। এ বিচার এখন প্রক্রিয়াধীন। 

ইত্তেফাক/পিও