স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারে যশোরে যুবক খুন, হত্যার ভিডিও ভাইরাল

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ২৩:০১

যশোর শহরের খড়কি কবরস্থান এলাকার লেদমিস্ত্রি রিপন হোসেকে (৩০) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে যশোর শহরের মুজিব সড়কের রেলগেটে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। 

নিহত রিপন ওয়ার্ড যুবলীগের সক্রিয় কর্মীও ছিলেন। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, সাত যুবক শহরের ব্যস্ততম সড়কের উপরে দৌঁড়ে দৌঁড়ে একজনকে মারছে। দুই জনের হাতের রয়েছে চাকু। তারা এলোপাতাড়ি ছুরি চালিয়ে জখম করছে। এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সাত যুবক পালিয়ে যাচ্ছেন। পথচারীরা ছুরিকাহত ঐ যুবককে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য গাড়িতে তুলছে।
  
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রিপনকে যারা হত্যা করেছে তারা এলাকার চিহ্নিত ও এক সময়ের রাজনীতিক সহকর্মী ছিলেন। এই ঘটনায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা করেনি নিহতের পরিবার। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যশোর পৌরসভার এক কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগ নেতাসহ পাঁচজনকে হেফাজত নেয় পুলিশ।

পুলিশ ও নিহত ব্যক্তির স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, চার ভাই বোনের মধ্যে রিপন তৃতীয়। তিনি যশোর রেলস্টেশন এলাকার লেদ কারখানাতে কাজ করতেন। পাশাপাশি তিনি ওয়ার্ড যুবলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ঘটনার দিন বিকালে তার স্ত্রী ও আট মাস বয়সী সন্তানকে শ্বশুরবাড়ি রেখে বাড়িতে আসেন। বাড়িতে খাবার খেয়ে সন্ধ্যায় শহরে বের হন। রাত আটটার দিকে যশোর রেলস্টেশন এলাকা থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন রিপন। শহরের রেলগেট এলাকায় পৌঁছালে প্রতিপক্ষের লোকজন অতর্কিত ছুরি মেরে জখম করে। গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার লাশ যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গ থেকে ময়নাতদন্ত শেষে কারবালা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। 

রিপনের মা রুপবান বেগম সাংবাদিকদের বলেন, তার ছেলে অনেক ভালো। আগে রাজনীতি করলেও সন্তান হওয়ার পরে সে আর রাজনীতি করতো না। লেদে কাজ করেই সংসার চালাতো। সোমবার হাসিমুখে ভাত খেয়ে সন্ধ্যায় বাইরে গেল। রাতে শুনলাম আমার ছেলেটা মার্ডার হয়েছে। সে হাসপাতালে রয়েছে। তিনি জানান, স্থানীয় খড়কি এলাকার সন্ত্রাসী ও যুবলীগনেতা আক্তারুজ্জামান ডিকুর সঙ্গে একসময় রাজনীতি করতো রিপন। ডিকুর সমাবেশে যাওয়া আসা করতো সে। ডিকুর সঙ্গে রিপন আর রাজনীতি না করাতে তাদের মধ্যে দ্বদ্বের সৃষ্টি হয়। 

নিহত রিপনের বোন নিলুফার ইয়াসমিন জানান, এলাকার আধিপত্য নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে খড়কি এলাকার ডিকুর সঙ্গে তাদের বিরোধ চলে আসছিল। তারই জের ধরে ডিকু বাহিনীর লোকজনে রিপনকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। এদিন রাত ৮টার দিকে রিপন এলাকার মুস্তাফিজুর রহমান মুস্তাকের সঙ্গে রিক্সায় চড়ে রেলগেট থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরছিল। পূর্বপরিকল্পিতভাবে ডিকুর নেতৃত্বে পিচ্চি রাজা, আসিফ, নিশান, দেলোয়ার হোসেন দেলা, সাকলাইন হোসেন, ইমন হোসেন, ফরিদ হোসেন, ওমর আলী ও শরীফসহ কয়েকজন দুটি ইজিবাইকে চড়ে মুজিব সড়কে অবস্থান নেয়। মুজিব সড়কে বেবী সপের সামনে আসামাত্র তাদের রিক্সার পথরোধ করে কুপিয়ে রিপনকে হত্যা এবং বিপুল ও মুস্তাককে আহত করে।

স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে জানা গেছে, খড়কি এলাকাতে রাজনীতি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন আক্তারুজ্জামান ডিকু অন্যটি হাফিজুর রহমান ভুট্টো। নিহত রিপন একসময় ডিকুর সঙ্গে চলাচল করলেও বর্তমানে তিনি ভুট্টোর সঙ্গে চলাচল করে আসছিলেন। প্রায় দুইপক্ষের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাসমাবেশে লোক নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিজেদের আধিপত্যে বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বলছে, ডিকু ও ভুট্টোর নামে হত্যা অস্ত্রসহ একাধিক মামলা রয়েছে। 

কোতয়ালী মডেল থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি আধিপত্যে বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পুলিশ হেফাজত নিয়েছিল। আবার সবাইকে ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। 

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, যশোর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আলমগীর কবির সুমন, যশোর পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ শাহজাহান কবির শিপলুসহ ৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদের কথা পুলিশ স্বীকার করলেও আলমগীর কবির সুমন ও শিপলুর কথা অস্বীকার করেছে।

ইত্তেফাক/পিও