উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বেড়া পাট ক্রয়কেন্দ্র এখন শুধুই স্মৃতি। অথচ এক সময় বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) উত্তরাঞ্চল থেকে পাট সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র ছিল এটি। কয়েক হাজার শ্রমিক ও পাটব্যবসায়ীদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে থাকত এলাকাটি। নানা প্রতিকূলতায় কয়েক বছরে ক্রয়কেন্দ্রটি এমনিতেই স্থবির হতে থাকে। এর মধ্যে বিজেএমসি তাদের পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় এখানে শুধু স্মৃতি হিসাবে রয়ে গেছে বড় বড় পাটের অসংখ্য গুদামঘর। এ অবস্থায় পাটব্যবসায়ীসহ শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
পাটব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, পাবনার বেড়া উপজেলার বেড়া বাজারে অবস্থিত পাট ক্রয়কেন্দ্রের খ্যাতি রয়েছে উত্তরাঞ্চল জুড়ে। এক সময় বিজেএমসির প্রায় সবগুলো পাটকলের ক্রয়কেন্দ্র ছিল এখানে। এ ছাড়া বেসরকারি কয়েকটি পাটকলেরও ক্রয়কেন্দ্র ছিল। সরকারি (বিজেএমসি) ও বেসরকারি পাটকলগুলো বেড়া ক্রয়কেন্দ্র থেকে পাট সংগ্রহ করে তাদের কারখানায় নিয়ে যেত। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ‘পাটপট্টি’ নামে পরিচিত এই ক্রয়কেন্দ্রে রয়েছে অর্ধ শতাধিক পাটের গুদাম।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে এই ক্রয়কেন্দ্রটি স্থবির হতে শুরু করে। ঐ সময়ে ইছামতী নদীর উত্সমুখে বাঁধ নির্মাণ করায় ক্রয়কেন্দ্রটিতে জাহাজ ও বড় বড় নৌকার প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাওয়াতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান। কিন্তু এর পরেও ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্রয়কেন্দ্রটি টিকে ছিল। কিন্তু বিজেএমসি পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় সংগত কারণে তাদের ক্রয়কেন্দ্রগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া এবার বেসরকারি কোনো পাটকলেরও ক্রয়কেন্দ্র বেড়ায় নেই। ফলে এবারের পাটের মৌসুমে শুনশান নীরব হয়ে আছে এই পাট ক্রয়কেন্দ্রটি।
ক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেড়া পাটপট্টিতে অবস্থিত অর্ধ শতাধিক পাটের গুদামসহ পাটব্যবসায়ীদের দোকানগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। সরেজমিনে ঘুরে এগুলোকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। এক সময় বেড়া ক্রয়কেন্দ্রে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করলেও শেষ পর্যায়ে তা ৫০০র কাছাকাছি নেমে আসে। ক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবারের পাট মৌসুমে কর্মরত সব শ্রমিকই বেকার হয়ে পড়েছেন। এসব শ্রমিকের দিন কাটছে চরম কষ্টে। কেউ কেউ কামলার কাজ বা রিকশা-ভ্যান চালানোর পেশা বেছে নিচ্ছেন। বেড়া পাট ক্রয়কেন্দ্রের শ্রমিক সরদার খবির উদ্দিন জানান, বেড়ায় আট শতাধিক তালিকাভুক্ত শ্রমিক রয়েছেন। এখন তারা সবাই বেকার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই জায়গার বেশির ভাগ শ্রমিকই ১৫ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করছে। অথচ হঠাত্ করে এসব শ্রমিক আজ বেকার হয়া গেল।’
এদিকে বেড়া পাট ক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপদে পড়েছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শতাধিক পাটব্যবসায়ী। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে তাদের আয়ের পথ। বেড়া বাজারের পাটব্যবসায়ী শামসুল ইসলাম বলেন, ‘এক সময়ের জমজমাট বেড়া পাটপট্টি আজ একেবারেই নীরব। পাটের ব্যবসা না থাকায় আমরা ব্যবসায়ীসহ শ্রমিকরা চরম কষ্টে আছি।’
