গদবাঁধা পদ্ধতিতে শিশুরা প্রায়ই পড়াশোনায় মনযোগ হারায়। অনেক সময় তারা বিষয়গুলো বুঝতে পারে না। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পড়াশোনার বিষয়গুলোতে মানসিক বিকাশের দিকটি থাকে উপেক্ষিত। ফলে শিশুরা পড়াশোনাকে তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বিষয় মনে করে এবং তাতে তারা কোনো আনন্দ খুঁজে পায় না। তবে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণে একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে ‘চলপড়ি’ নামে একটি শিক্ষামূলক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।
এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্কুলগামী শিশুরা মজার মজার অডিও-ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট ও রঙ-বেরংয়ের ছবিওয়ালা বইয়ের মাধ্যমে তাদের ক্লাসের পড়া ও অন্যান্য প্রযোজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। আর শেখার এই পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে একেকজন শিশুর আলাদা আলাদা শেখার ধরণ অনুযায়ী। যেমন কোনো কোনো শিশু অ্যানিমেটেড ভিডিও দেখে ক্লাসের পড়া সবচেয়ে ভালো শিখতে পারে। চলপড়িতে সেই সুযোগ রাখা হয়েছে। আবার, যে শিশু গানের তালে তালে কিংবা গল্পে গল্পে ক্লাসের কোনো পড়া শিখতে পছন্দ করে, তার জন্য সেভাবেই শেখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
ইংরেজি ও গণিত বিষয় নিয়ে অভিভাবক ও শিশুদের সহায়তার জন্য ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে চলপড়ি নামের এই অনলাইন প্লাটফর্ম। সরকারি শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পড়াশুনার ব্যবস্থা করে শিশু ও অভিভাবকদের কাছে ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই প্ল্যাটফর্মটি।
চলপড়িতে এনসিটিবি বইয়ের ভিত্তিতে তৈরি পাঠই অনুসরণ করা হচ্ছে। শিশুরা এসব পাঠ শেখে বিভিন্ন অ্যানিমেটেড ক্যারেক্টারের মাধ্যমে। কাঁঠাল, রোবট, মেঘ, মেঘ মামা, চলপট্টির শিক্ষক মিস পেঁচার মতো অ্যানিমেটেড ক্যারেক্টারগুলো শিশুর পড়ালেখাকে করে তোলে আনন্দের। এতে করে সে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় নিজের উৎসাহেই ক্লাসের পড়া শিখে ফেলতে পারবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, চলপড়ির শিক্ষা উপকরণগুলো শিক্ষকরাও ব্যবহার করতে পারবেন।
চলপড়ির অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাখা আছে রঙ-বেরংয়ের ছবিওয়ালা বইয়ে ভরা ডিজিটাল লাইব্রেরি ‘বইঘর’। এখানে আছে সব বয়সের শিশুদের উপযোগী বাংলা ও ইংরেজি বই। যারা মাত্র পড়তে শিখছে, তাদের উপযোগী বই আছে বইঘরে। আবার যারা পড়া শিখে ফেলেছে, ভাদের ভাষা দক্ষতাকে আরও বাড়ানোর উপযোগী বইও আছে এখানে। রিড অ্যালাউড ও হাইলাইটিং ফিচারসম্পন্ন এই বইগুলো শিশুর পড়ার দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তার মাঝে সহযোগিতার মনোভাব গড়তে তুলতে সাহায্য করে, বিকাশ ঘটায় তার কল্পনাশক্তির।
বর্তমানে চলপড়িতে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির জন্য পাঠ ও প্র্যাকটিস রয়েছে। বইঘরের বইগুলো পড়তে পারবে সব বয়সী শিশুরাই। আর এখন নতুন শিক্ষাক্রমের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ৬ষ্ঠ শ্রেণির জন্যও পাঠ ও প্র্যাকটিস তৈরির কাজ করছে তারা, যা ২০২৪ সাল থেকেই চলপড়ি ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
চলপড়ির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেরীন মাহমুদ হোসেন বলেছেন, চলপড়ির মধ্য দিয়ে আমরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে জাতীয় পাঠ্যক্রমের অধীনে থাকা বাংলাদেশের প্রায় আড়াই কোটি শিক্ষার্থী আনন্দের সাথে শিখতে পারবে। দেশের প্রতিটি শিশু মজার মজার সব শিক্ষা উপকরণের সাহায্যে অর্জন করবে নানা দক্ষতা। চলপড়ি ব্যবহার করে একজন অভিভাবক যেমন তার সন্তানকে বাড়তি শেখার সুযোগ তৈরি করে দিতে পারবেন, তেমনি চলপড়ির মাল্টিমিডিয়া পাঠ, প্র্যাকটিস, পডকাস্ট ও বই ব্যবহার করে একজন শিক্ষকও তার ক্লাসের পড়ায় নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারবেন। এমন সব লক্ষ্য নিয়েই চলপড়ির জন্ম, এর জন্ম এমন একটি সুযোগ তৈরি করার জন্য, যেখানে শিশু শিখতে পারবে নিজের মতো করে।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে দেশে নতুন শিক্ষাক্রমের ঘোষণা আসে। সেখানে দেখলাম, চলপড়িতে শিশুদের শেখার জন্য যে পরিবেশ আমরা তৈরি করেছি, এবার ঠিক তেমনই একটি পরিবেশ পেতে চলেছে সারা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। চলপড়ির মতোই এই শিক্ষাক্রমে অবস্থা প্রতিযোগিতার বদলে একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে ক্লাসের পড়া শেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
জেরীন মাহমুদ হোসেন বলেন, মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করার বদলে প্রযোজনীয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি। নতুন এই শিক্ষাক্রমটি এতটাই যুগোপযোগী ও আধুনিক যে, একে তুলনা করা হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে। সেখানেও প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হওয়া প্রতযোগিতা নেই শিশুদের মাঝে। বরং তারা শেখে আনন্দের নিজের মতো করে। আর আমরা এটা ২০২০ সাল থেকেই চর্চা করছি চলপড়িতে।

