ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:১৭

সম্প্রতি বাংলাদেশে ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। একসময় মানুষ যানবাহনের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করত রেলপথ। কিন্তু এখন রেলপথেও বেড়েছে ঝুঁকি। এমন অনিরাপদ হওয়ার মধ্যে কিছু প্রধান ইস্যু উল্লেখযোগ্য। এ বছর সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে ২৩ অক্টোবর ভৈরবে। মুখোমুখি এ দুর্ঘটনায় প্রায় ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশে এমন রেল দুর্ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত। কেন এমন হচ্ছে? এর জন্য দায়ী কে? এমন ভাবনায় কিছু কারণ তুলে ধরছি—

রেল ও রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে রেলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা। এছাড়াও অপারেশনের ঘাটতির কারণে একই লাইনে দুটি ট্রেন চলে আসতেও ইদানীং দেখা যায়। ঠিক এমনটাই ঘটেছে সম্প্রতি ভৈরব রেল দুর্ঘটনায়।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট তথ্য সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে যে ধীর গতিতে ট্রেন চলাচল করে, সেখানে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটার জন্য রক্ষণাবেক্ষণের অভাবই দায়ী। রেলওয়ের রোলিং স্টক বা বাহনগুলো সব নতুন হওয়ার পরও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে রেললাইনের বেজ বা ভিত্তি ঠিক থাকে না, ভিত্তির লেভেল ঠিক থাকে না, নিচে যে উপাদানগুলো থাকে সেগুলো ঠিক সময়ে পরিবর্তন করা হয় না এবং জোড়াতালি দিয়ে রাখা হয়। এ কারণেই দুর্ঘটনা হয়ে থাকে। দেশে রেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্বল ইঞ্জিন এবং সংস্কারবিহীন রেলপথ।

লেভেল ক্রসিং: ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং। রেলওয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২ হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথে রেলক্রসিং আছে প্রায় ২ হাজার ৫৪১টি। প্রায় প্রতি কিলোমিটারে একটি করে লেভেল ক্রসিং আছে। এসব ক্রসিংয়ের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশে কোনো গেট নেই বলে জানা যায়। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট তথ্য সূত্রে জানা যায়, এসব লেভেল ক্রসিংয়ের বেশির ভাগই অনুমোদন ছাড়া, যা জনগণের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে। লেভেল ক্রসিং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটা জায়গা। প্রত্যেকটা লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল না থাকায় বা দায়িত্বপালনে অবহেলার জন্যও দেশে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাগুলো প্রচুর পরিমাণে হচ্ছে।

লোকবলসংকট ও দায়িত্বপালনে অবহেলা: বাংলাদেশের রেলওয়েতে লোকবলের সংকট ও দায়িত্বপালনে কর্মচারীদের অবহেলা অন্যতম কারণ। যার ফলে দিনদিন দুর্ঘটনা ঘটার অভিযোগ আজ নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৩ সালে দেশে রেলের জনবল ছিল ৬৮ হাজার। ২০১৯ সালের দিকে এই সংখ্যা কমে এসে দাঁড়ায় ২৭ হাজারে। বর্তমানে ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও আশানুরূপ দক্ষ লোকবল তৈরি হয়নি। অভিজ্ঞ লোকোমাস্টার বা ট্রেনচালক যেমন দরকার ঠিক তেমনি ট্রেনের শিফট বা শিডিউল যারা ব্যবস্থাপনা করেন সেই স্টেশন মাস্টারও দরকার। আর এই দায়িত্ব পালনে অনেক বেশি দক্ষতা ও ধৈর্য অত্যন্ত প্রয়োজন। স্টেশন মাস্টারদের যে ধরনের দায়িত্বশীল হওয়ার কথা, সেখানে গাফিলতির কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। শিডিউলের টাইম মিসটেকের জন্যও মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে এবং নিহতের মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ এতে সিগন্যালিংয়ে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্টেশন মাস্টার থাকলেও দক্ষ জনবলের এখনো রয়েছে ঘাটতি। তাই দায়িত্বপালনে সবাইকে আরো সর্তক হওয়া জরুরি প্রয়োজন।

অবৈধ দখলদারি: যেহেতু ট্রেন আর্টিকুলেটেড জোড়া লাগানো গাড়ি, সেহেতু এটি হঠাত্ করেই ব্রেক করতে পারে না। কারণ এতে যাত্রীরা ঝুঁকিতে পড়ে যায়। যার ফলে ট্রেনের নীতিমালায় বলা আছে যে, রেল ট্র্যাকের ১০ ফুটের মধ্যে সব সময় ১৪৪ ধারা জারি থাকবে অলিখিতভাবে। কেউ তার আশপাশে আসতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে এর উলটোটা দেখা যায়। হঠাত্ উদ্যোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও কয়েক দিন পর আবারও আগের মতো হয়ে যায়। রেললাইনের আশপাশের জমিটাকে মানুষ নিজের মনে করে বসতি, রাস্তা, দোকানসহ খোলাবাজার নিয়ে বসে পড়েন। দুর্ঘটনা এড়াতে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং সার্বক্ষণিক তা তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে।

রেল দুর্ঘটনা এড়াতে চাই সচেতনতা: সবচেয়ে বড় কথা, রেল দুর্ঘটনা এড়াতে লাগবে রেল অধীনস্থ সব দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী ও সর্বসাধারণের সচেতনতা। লেভেল ক্রসিং মেনে চলে যানবাহন চালানো এবং রেললাইনে হাঁটা পরিত্যাগ করাসহ অসাবধানতা থেকে সর্তক হওয়া খুবই জরুরি। তাহলেই রেলযাত্রা ও যে কোনো যাত্রা হবে নিরাপদ।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন