বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে ঢাকার প্রবেশ পথ এবং সংলগ্ন মহাসড়কে চলছে তল্লাশি। শুক্রবার জুমার নামাজের পর এই তল্লাশি আরও বেড়ে যায়। তল্লাশির মুখে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। বিএনপির দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের ৩৩০ জন নেতা-কর্মীকে আটক এবং ১৮টি মামলা দিয়েছে পুলিশ।
এরই মধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, বিএনপিকে নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনেই মহাসমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে তিনি আরও বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বিষয়টি জানাবেন।
গত চারদিনে সারাদেশে এক হাজার ৩৫০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (শুক্রবার বিকাল ৫টা) কোনো দলকেই সমাবেশের জায়গার অনুমতি দেয়নি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, ‘দুটি বড় দলই যেহেতু সমাবেশের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে আমরা তাদের অনুমতি দেবো। তারা সমাবেশ করবেন। তবে কোন জায়গায় সমাবেশ তারা করবেন, সে ব্যাপারে আরও পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
আর জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কিনা তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করবে।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সকালে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নয়াপল্টনেই তাদের সমাবেশ করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কথা জানান। শনিবার সমাবেশ হলেও শুক্রবার দুপুরের পর থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা নয়াপল্টনে জড়ো হতে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন জানিয়েছেন, বিএনপি যদি নয়াপল্টনে সমাবেশ করে তাহলে তারাও বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটেই শান্তি সমাবেশ করবেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও এরই মধ্যে পাড়ায়, মহল্লায় অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে ঢাকার প্রবেশ পথ এবং মহাসড়কে পুলিশ ও র্যাব ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে। জুমার নামাজের পর এই তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। র্যাব-২-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শুক্রবার সকাল থেকে মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট, হাজারিবাগ, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও এবং তেজগাঁও শিল্প এলাকায় বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উত্তরা পূর্ব থানার ওসি অপারেশন মাহমদুল হাসান জানান, ‘জুমার নামাজের পর থেকে আমরা তল্লাশি জোরদার করেছি। উত্তরা এলাকাসহ ঢাকার সব প্রবেশ পথেই তল্লাশি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চেকপোস্ট বসিয়ে এই তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’
ঢাকার যাত্রাবাড়ী, কেরানিগঞ্জ, গাবতলী, সাভার, টঙ্গিসহ সব প্রবেশ পথেই এই তল্লাশি চলছে। যানবাহন ছাড়াও যাত্রী ও পথচারীরা দেহ তল্লাশির মুখে পড়ছেন। তল্লাশির কারণে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। অন্য দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
কয়েকটি সূত্র জানায়, রাতে সারাদেশে দূর পাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকতে পারে।
বিএনপি জানিয়েছে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আকতার হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী মনির হোসেন ও কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সদস্য তাজুল ইসলামকে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বিএনপির দাবি, কুষ্টিয়া জেলা কৃষকদলের সদস্য মেহেদী হাসানকে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর পুলিশি নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে গত চারদিনে মোট এক হাজার ৩৫০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের। বিএনপি আরও দাবি করে, গত ২৮ জুলাই থেকে চার হাজার ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মামলা হয়েছে ৪১৮টি এবং মোট আসামি করা হয়েছে ২৮ হাজার ৫৭০ জনকে।
শুক্রবার বিকালে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, ‘শনিবার রাজনৈতিক দলগুলোর মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সমাবেশকে ঘিরে লাখ লাখ মানুষের জমায়েত হবে। এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডিবির একাধিক টহল টিম কাজ করছে। ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছ। বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি করা হচ্ছে।’
বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। যাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
বিএনপি ও তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরীকরা সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে শনিবারের মহাসমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। সমাবেশ থেকে তারা ধারবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে। তারা এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। আর এর বিপরীতে আওয়ামী লীগ একই দিনে ঢাকায় পাল্টা শান্তি সমাবেশ করবে। তাদের কথা বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন না।
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল এবং জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
শনিবার দুই দলের মুখোমুখি এই অবস্থানে ঢাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আছে জনমনে শঙ্কা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘আমরা গত ৫০ বছরেও সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে যেতে পারিনি। যে ক্ষমতায় যায় সেই ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অনেক এগিয়ে গেলেও আমাদের এখানে কোনো পরিবর্তন নেই। তারাই বহিঃপ্রকাশ আমরা রাজনীতিতে বারবার দেখি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।’
তিনি মনে করেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হলে এই পরিস্থিতি হতো না। আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি নির্বাচন তো অন্য নির্বাচনের চেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সেটাও আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ফলে আবার সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।’
(এই প্রতিবেদনের সকল দায়ভার জার্মানি সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের। ডয়চে ভেলে বাংলা সংস্করণের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন)
