জুম চাষের একাল-সেকাল

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:৪২

এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষই ছিল একমাত্র কৃষিব্যবস্থা। সে সময় লোক সংখ্যা কম থাকায় জুমের আবর্তনকাল ছিল দীর্ঘ। ফলে ফলনও হতো অত্যধিক। এক মৌসুমের ফসলে দেড়-দুই বছরের খোরাকি হয়ে যেত জুমিয়া পরিবারের। এ জুম চাষই ছিল এখানকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার অন্যতম ক্ষেত্র এবং এ বৃহত্ জনগোষ্ঠীর ‘ফুড ব্যাংক’ বা খাদ্যভান্ডার। শুধু তা-ই নয়, জুম চাষকে ঘিরে রয়েছে তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, আবেগ-আনন্দ, ধর্মীয় অনুভূতি। পার্বত্য চট্টগ্রামের (খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি) ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিটি সম্প্রদায়ই জুম চাষ করে। তবে একেক উপজাতি ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত করে তাদের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষকে। যেমন চাকমা ভাষায় ঝুম, মারমা সম্প্রদায় ইয়াঁ, ত্রিপুরারা হুগ, ম্রো ভাষায় উঃঅ, খিয়াংরা লাই, বম ভাষায় লাও। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু নয়, বিশ্বের নানা দেশে নানান নামে জুম চাষের প্রচলন রয়েছে। জুম চাষের উত্পত্তি মূলত সুইডেন থেকে। ভারতের মেঘালয়, আসাম, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও ত্রিপুরা রাজ্যে জুম নামে, মিয়ানমারে টংয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় লাডাং, আফ্রিকায় জান্তে, মধ্য আফ্রিকায় মিলপা, ব্রাজিলে রোকা, মধ্য ভারতে ধাইয়া ও পেন্দা নামে আখ্যায়িত করা হয় পাহাড়ের এ জুম চাষকে। জুমচাষিরা পৌষ-মাঘ মাসে পাহাড়ের ঢালে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে শুকানোর পর ফালগুন-চৈত্র মাসে সেসব জঙ্গল আগুনে পুড়িয়ে জুমের খেত তৈরি করেন। এরপর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পোড়া জুমের মাটিতে দা দিয়ে গর্ত করে একসঙ্গে ধান, তুলা, তিল, তিসি, কাউন, ভুট্টা, ফুটি, চিনার, যব, হলুদ, আদা ইত্যাদি ফসলের বীজ বপন করেন। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে জুমের ফসল ওঠা শুরু হয়। সে সময় মারফা (পাহাড়ি শসা), কাঁচা মরিচ, চিনার ও ভুট্টা পাওয়া যায়। ধান পাকে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে। সবশেষে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে তিল, যব ও তুলা ঘরে তোলা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম চাষের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮১৮ সালের আগে এ অঞ্চলে জুম চাষই ছিল একমাত্র কৃষিব্যবস্থা। পরে চট্টগ্রামে বাঙালিদের সঙ্গে সম্ভ্রান্ত উপজাতীয় পরিবার, বিশেষ করে রাজা ও দেওয়ানদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হলে পাহাড়িদেরও লাঙল চাষের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয়। বলা হয়, চাকমা রাজা ধরমবক্স খাঁ চট্টগ্রাম থেকে কয়েকটি বাঙালি মুসলমান পরিবারকে নিয়ে এসে রাঙ্গামাটির কর্ণফুলী নদীর উপত্যকায় লাঙল চাষ পদ্ধতি চালুর সূচনা করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টম হার্বাট লুইন তার এক প্রতিবেদনে লিখেছেন—১৮৬৭ সালেও তিনি কোনো পাহাড়িকে লাঙল দিয়ে চাষ করতে দেখেননি। তবে কিছু ধনী উপজাতি বাঙালি শ্রমিকের মাধ্যমে নিজেদের জমিতে লাঙল চাষ করাতেন। লুইনের ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮৬৯ সলে প্রতিটি পরিবার গড়ে ৩ দশমিক ৬ একর জুম চাষ করত এবং প্রতি একর জুমে শাকসবজি ছাড়াও ২০ মণ ধান, তিন মণ তুলা ও দুই থেকে সাড়ে তিন মণ তিল উত্পাদিত হতো। ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতবাড়ির খাজনাপ্রথা চালু হয়, ১৮৭০ সালে এটিকে জুম খাজনা করা হয়। পরিবারপিছু চার আনা জুম খাজনা থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হতো এক আনা, রাজা দুই আনা ও এক আনা খাজনার অংশ আদায়কারী বা হেডম্যানরা পেতেন।

১৯৭৫ সালে হিল ট্রাক্টেস গেজেটিয়ার অনুসারে ১৮৮০ সালে জুমিয়া পরিবারের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৮৩২, ১৮৯৫ সালে ৯ হাজার ২৭৪, ১৯০৫ সালে ১৫ হাজার ৩৩৬ এবং ১৯১৫ সালে ২৩ হাজার ২২১। ব্রিটিশ গবেষক এফ ডি আস্কেলি তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জুমের আবর্তনকাল ও ফলন দুই-ই কমে গেলে সরকারিভাবে পাহাড়িদের সমতলের লাঙল চাষে উত্সাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জুমকর বাড়ানোর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে সমতলের লোকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ১৯৫০ সালে সড়ক ও নদীপথে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো, এমন এলাকায় জুমিয়া পরিবারের সংখ্যা অনেক কমে আসে। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুত্ বাঁধ তৈরির পর ৪০ ভাগ প্রথম শ্রেণির চাষযোগ্য জমি, তথা ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি ডুবে গেলে জুমিয়াদের সংখ্যা বেড়ে যায়। ১৯৬১ সালে জুমিয়া পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯ হাজারেরও বেশি। ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষ’ বইয়ে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে তিন পার্বত্য জেলায় জুমিয়া পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩০-৩৫ হাজার। রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২০ সালের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, তিন পার্বত্য জেলায় জুমিয়ার সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৩৭ জন। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ২৩ হাজার ৫০০, বান্দরবানে ১৫ হাজার ৪৮ ও খাগড়াছড়িতে ৪ হাজার ৩৯০। জুমিয়া পরিবারের সংখ্যা বাড়লেও কমেছে জুম ভূমি ও জুমের ফলন। একসময় একরে ধান উত্পাদন হতো প্রায় ২০-২৫ মণ। এতে চলে যেত জুমিয়া পরিবারের দেড়-দুই বছরের খোরাকি। আর এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাওয়া যায় একরে মাত্র ১০-১১ মণ ধান। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জুম ভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া, জুমের আর্বতনকাল দুই-তিন বছরের মধ্যে চলে আসা। আগে এক পাহাড়ে একবার চাষ করার পর ১৫-১৬ বছর পর পুনরায় ঐ পাহাড়ে চাষ হতো। আর এখন দুই-তিন বছর পরই চাষ করতে হয় বাধ্য হয়ে। ঘনঘন চাষ করার কারণে উর্বরতা হারিয়ে গেছে পাহাড়ের। ফলে উত্পাদন অনেক কমে গেছে। ফলন কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ফলেও জুমের হ্রাস পেয়েছে। ভূমি ও ফলন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জুমিয়ারা এখন অনেক জাতের ধান ও সাথি ফসলের আবাদও ছেড়ে দিয়েছেন। আগে জুমে মুম্বই, কবরক, গেলং, রেঙ্গুই, গুড়ি চিনেল, পাট্রিকি, রাঙ্গাগেলন, সোনালি চিকনসহ বিভিন্ন প্রকারের আঠালো বিন্নি ধানের চাষ হতো। এখন জুম ভূমি ও ফলন কমে যাওয়ায় এগুলোর চাষ হয় না বললেই চলে। জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত জুমচাষিদের আপত্কালীন। একসময় এ আপত্কালীন খাদ্যসংকট মোকাবিলার জন্য জুমের নতুন ধান ঘরে তোলার পর সবাই মিলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান সংরক্ষণ করে রাখত একটি ঘরে। খাদ্যসংকটে পড়লে সেখান থেকে ১০-৫০ হাঁড়ি পর্যন্ত ধান ধার নিতে পারত যে কেউ। পরের বছর জুমের ধান তোলার পর ১০ হাঁড়ির বিপরীতে ১৩ হাঁড়ি করে ধান শোধ করতে হতো। পরবর্তী সময় এ প্রথা কাজে লাগিয়ে গঠন করা হয় ‘রাইস ব্যাংক’। কিন্তু জুমের আবাদ কমে যাওয়ায় সেই রাইস ব্যাংকও বিলুপ্তির পথে। এখন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী এ জুম চাষ নিয়ে গবেষণাও চলছে। অবৈজ্ঞানিক সনাতনী পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কৃষিবিদরা বলছেন, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে মৃত্তিকা ক্ষয় হচ্ছে। এতে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে এবং প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ হলে জুমে উত্পাদন যেমনি বাড়ানো সম্ভব, তেমনি পরিবেশ ও প্রকৃতিও সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন