আজ ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর। পঁচাত্তরের এই দিনে কোনো অভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল হঠকারী, অপরিপক্ব ও ব্যর্থ প্রয়াস। যার ফলশ্রুতিতে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর ৩ নভেম্বরের কোনো পালটা অভ্যুত্থানও ছিল না। জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের কিছু মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই ৭ নভেম্বরের কুশীলবরা এই সময়টিকে বেছে নিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোররাতে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা বীর বিক্রম ও কর্নেল হায়দার বীর উত্তম নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বের ‘সৈনিক সংস্থা’র বিপথগামী সৈনিকদের হাতে আরও ১১-১২ জন টগবগে তরুণ লেফটেন্যান্ট ও ক্যাপ্টেন নিহত হয়েছিলেন। নিহত হন ঢাকা সিএমএইচে কর্তব্যরত একজন কর্নেল পদমর্যাদার মহিলা ডাক্তার, সেক্টর কমান্ডার উসমান সাহেবের স্ত্রী। খালেদ মোশাররফসহ এই অফিসারদের হত্যার বিচার আজও হয়নি।
৭ নভেম্বর একটি পর্যালোচনা
সায়েম দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আগের পার্লামেন্ট বাতিল করা হলো এবং দেশবাসীকে নতুন নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হয়। দেশের মধ্যে গত দুই দিনের নানাধরনের জল্পনা-কল্পনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল। খালেদের এত সতর্কতা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মহল বলাবলি করছিল—খালেদ আওয়ামী লীগ সমর্থক, খালেদ থাকলে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। তবে এ ব্যাপারে জনগণের মধ্যে কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি, যেহেতু নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ছিল। সেনাবাহিনীতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ খালেদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইংরেজিতে একটি কথা আছে—‘ডিফিট ইজ অ্যান অরফান।’ ৭ নভেম্বরের কারণে খালেদকে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হলো ইতিহাসে। আমি আগেও বলেছি, ৭ নভেম্বরের ঘটনা ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পালটা কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলোতে কয়েক জন করে প্রতিনিধি গোপনে সৈনিক সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। হাই কমান্ডের নির্দেশে ৭ নভেম্বরকে তারা বেছে নিয়েছিল সঠিক সময় হিসেবে। ৬ নভেম্বর রাতে এলিফ্যান্ট রোডে কর্নেল তাহেরের ভাই আনোয়ার সাহেবের বাসায় জাসদ, গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গোপন বৈঠক করে এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মোটামুটি প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে। ঢাকার সর্বত্র তারা একটি লিফলেট বিতরণ করে। সন্ধ্যায় ঐ লিফলেট বিতরণের পর ঢাকায় বিভিন্ন মহলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীতেও সৈনিক সংস্থার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। তাদের সিদ্ধান্ত ছিল সেনানিবাসে রাত ১২টা ১ মিনিটে সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে মোটিভেটেড সৈনিকরা ওপরের দিকে গুলি শুরু করবে। এটিই হবে জাসদ ও গণবাহিনীর জন্য সংকেত। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল বের করবে। আদমজী থেকে একটি বড় মিছিল বের করার পরিকল্পনা ছিল। সেনানিবাসে সৈনিক বিদ্রোহের সমর্থনে মিছিল চলবে এবং জনসমর্থন পক্ষে আনার প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হবে। ১২টা ১ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল। একই সময় বাইরে পরিকল্পনা অনুযায়ী, যে মিছিলটি ঢাকায় হয়েছিল, তা আকারে খুব একটা বড় ছিল না। সকালের দিকে যদিও খণ্ড খণ্ড মিছিল রাস্তায় ছিল, সেই মিছিলগুলোতে জাসদ ছাড়াও অনেক আওয়ামী লীগবিরোধী লোক ছিল।
৪ নভেম্বর খালেদের বৃদ্ধা মাতাকে সামনে রেখে রাশেদ মোশাররফ ও মোস্তফা মহসিন মন্টুর নেতৃত্বে যে মৌন মিছিল বেরিয়েছিল, অনেকে পরবর্তী সময়ে এই মিছিলকে খালেদের ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের সমর্থনে ছিল বলে অপপ্রচার শুরু করে। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় ৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে যে লিফলেট প্রচারিত হয়, এতে জনগণের মধ্যে নতুনভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহের ঘটনা সমর্থনে যদি জাসদের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীতে ব্যাপক মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমর্থন জোরদার করতে পারত, তাহলে জিয়াউর রহমান লংমার্চের পরিকল্পনা বাতিলসহ আরও অনেক সিদ্ধান্ত নিতে সংকটে পড়তেন। জনগণের মধ্যে জাসদের সমর্থন ব্যাপক ছিল না এবং পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার পরিকল্পনা মোতাবেক করতে না পারায় সকাল ১০টা-১১টার মধ্যে জাসদের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিল।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অনেক আগেই এই মৌন মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। তাই এই মিছিলের সঙ্গে খালেদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে ৭ নভেম্বর সকাল ১০টা-১১টা পর্যন্ত সৈনিক সংস্থার ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই’ স্লোগান সহকারে অফিসার হত্যার এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। কর্নেল তাহের সেনানিবাসের বাইরে থেকে সৈনিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল। যদিও অধিকাংশ সিপাহি এর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল, কিন্তু বেশির ভাগ সৈনিক আসল পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য জানত না। অনেকেই অফিসার হত্যাকে সমর্থন না করে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরে আসুক চেয়েছিল। অফিসার হত্যা অব্যাহত রেখে পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণে না আসে, সেজন্য জাসদের একটি অংশ ছাড়াও দেশি-বিদেশি আরও একটি চক্রও জড়িত ছিল বলে অনেকের অভিযোগ। জাসদের একটি অংশও এ ব্যাপারটিকে সমর্থন করছিল না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে কর্নেল তাহেরদের পরামর্শক্রমে সৈনিক সংস্থার সদস্যরা অন্যান্য জিয়া ভক্ত সৈনিকদের নিয়ে জিয়াকে গৃহবন্দি থেকে উদ্ধার করে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে অর্থাৎ কর্নেল রশিদের ইউনিটে নিয়ে আসে। সৈনিক সংস্থা ও জাসদ চেয়েছিল সেই মুহূর্তে যেহেতু জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাকে সামনে রেখে সিপাহিদের তাদের পক্ষে আরও সুদৃঢ় করা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। জিয়া বিষয়টি বুঝে ওঠার জন্য, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর কমান্ড ঠিক করতে প্রথম কয়েক ঘণ্টার জন্য সব ব্যাপারে জাসদের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন। ঢাকা সেনানিবাসের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের পাশাপাশি জিয়া জাসদের রব ও জলিলসহ অন্যদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ১২টার মধ্যে জিয়া সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড মোটামুটি ঠিক করে ঢাকা সেনানিবাসের শৃঙ্খলা অনেকটা ফিরিয়ে আনেন। এক কথায় সেনানিবাসের পরিস্থিতি জিয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।
ঢাকায় তখন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জাসদের লংমার্চের প্রস্তুতি চলছিল। খন্দকার মোশতাক সেনাবাহিনীর ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে বসে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, সবকিছু তার পক্ষে হচ্ছে। জিয়া তো তারই সেনাপ্রধান ছিলেন। তাই তিনি যেহেতু সেনানিবাসকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, জিয়া তার অনুগত থাকবে। সেনাবাহিনীর সৈন্য বোঝাই কয়েকটি ট্রাকবহর মিছিল করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে যায়। জিয়া ১২টার পরে লংমার্চে যোগদানের জন্য শহিদ মিনারে আসার কথা ছিল। তিনি আর এলেন না। আর্মির যেই অংশটি সেই সময়ে শহিদ মিনারে গিয়েছিল, তারা লংমার্চের উদ্দেশ্যে সমাবেত জাসদ কর্মী ও নেতৃবৃন্দকে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে মারধর করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। জাসদের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জিয়া এবং তাহেরের নামে স্লোগান দিচ্ছিল। শহিদ মিনারের আশপাশে মোশতাকের কিছু পোস্টার ও ছবি ছিল। জাসদের উত্তেজিত নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর সেগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেয় এবং মোশতাকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। এর আগে কর্নেল তাহের রেডিও স্টেশনে এসেছিলেন ভাষণ দেওয়ার জন্য, সেখানে তখন মোশতাকও উপস্থিত ছিলেন। তাহের বা মোশতাক কাউকেই ভাষণ দিতে দেওয়া হলো না। জিয়াকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করার আগে কর্নেল তাহের যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে ৭ নভেম্বর ভোরে রেডিওতে ভাষণ দিতে পারতেন। এজন্য যে, তখন পরিস্থিতি অনেকাংশে তাহেরের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সর্বত্র একটা বিভ্রান্তি ও থমথমে ভাব বিরাজ করছিল। সেক্ষেত্রে সেনানিবাসের বাইরে জাসদের রাজনৈতিক মোবিলাইজেশন ব্যাপক হতো এবং ভাষণের পরপর জিয়াকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করলে কর্নেল তাহের কিছু সময়ের জন্য তার একটি গ্রহণযোগ্যতা ও সমর্থন বৃদ্ধির চেষ্টা করতে পারতেন। সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে চাপা ক্ষোভ, একের প্রতি অন্যের হিংসা ও প্রতিশোধের অভিপ্রায় বিরাজ করছিল। সবকিছু উপেক্ষা করে তাহেরের একার পক্ষে শুধু সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে পুরো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি কমান্ডের অধীনে এনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। এই বাস্তব উপলব্ধিতেই জিয়াকে গৃহবন্দি থেকে মুক্ত করে এনে প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে সামনে রেখে সবকিছু সামাল দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছিল। গৃহবন্দি থেকে জিয়াকে মুক্ত করে আনার সময় তাকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল দেশব্যাপী, বিশেষ করে ঢাকায় তাদের সমর্থনে ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার ঢল নামবে এবং পুরো সেনাবাহিনীর সৈনিকরাও একতাবদ্ধ। জিয়া দ্বিতীয় ফিল্ডে বসে দেখলেন, সেনাবাহিনীর সৈনিকদের মধ্যে যে অংশটি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের সমর্থনে বাইরে তেমন কোনো রাজনৈতিক সমর্থন নেই। অর্থাৎ জাসদ তাদের পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়েছে। ঐ পরিস্থিতিতে কারো পক্ষে সেনাবাহিনীকে একতাবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না, বিধায় জিয়া সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জোর দেন এবং তার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন। এক্ষেত্রে জিয়া অন্যের সৃষ্ট সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলেন। শুধু প্রশ্ন থেকে যাবে যে, জিয়ার কী আর কোনো বিকল্প ছিল? জিয়ার পরবর্তী কার্যক্রমগুলো কী জাতীয় স্বার্থে ছিল? ঐ সময়ের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জিয়ার জায়গায় অন্য কোনো সেনা অফিসার থাকলে তার কী করণীয় ছিল? ইতিহাস এর মূল্যায়ন করবে।
আমি আগেও বলেছি, ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানের সুবাদেই জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরদিন জিয়ার পূর্ব প্রতিশ্রুতি মোতাবেক রব ও মেজর জলিল কারাগার থেকে মুক্তি পান। জিয়া যদি লংমার্চে আসতেন এবং নেতৃত্ব দিতেন, দেশের অবস্থা কী হতো তা উল্লেখ না করে বলব, জাসদ পরবর্তী সময়ে কখনো তাদের নেতা হিসেবে জিয়াকে গ্রহণ করত না। শেষ পর্যন্ত তাহেরই নেতৃত্বে আসার চেষ্টা করতেন। জিয়ার এ ব্যাপারে সজাগ উপলব্ধি ছিল। তাই জিয়া বেলা ১১টা পর্যন্ত জাসদের সঙ্গে ঐকমত্যে ছিলেন। ১১টার পরে লংমার্চে শরিক না হয়ে জিয়া জাসদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনানুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন করে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সেই মোতাবেক তিনি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন।
জিয়া বেলা ১১টার পরে জাসদের সঙ্গে তার পূর্ব প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আর কোনো সমঝোতা রক্ষা করছিলেন না। পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একের পর এক জাসদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গিয়েছিলেন। সেজন্য জাসদ জিয়াকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। জিয়াও ১১টার পরে লংমার্চে না গিয়ে প্রশাসন ও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। বিশেষ করে, আমেরিকান দূতাবাসের সঙ্গে লংমার্চের নির্ধারিত সময় দুপুর ১২টার আগেই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরে নেন। জিয়া লংমার্চে না গিয়ে কৌশলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে এনে বিচারপতি সায়েমকে প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর রেখে নিজে সেনাপ্রধান ও ডেপুটি চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেদিনের এবং সে সময়কার পরিস্থিতিতে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে জিয়ার হাতে হয়তো এর বিকল্প কিছু করণীয় ছিল না। জিয়ার কৌশলগত এই ভূমিকার বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যেও তখন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল না। সবাই আশা করেছিল, জিয়া নতুন নির্বাচন দিয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করবেন। ৭ নভেম্বরের প্রথম পর্বে সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে জিয়াকে গৃহবন্দি থেকে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসা, জিয়ার সঙ্গে জাসদের সমঝোতা, পরে সমঝোতা ভেঙে যাওয়া এবং সর্বোপরি দ্বিতীয় পর্বে জাসদ ও মোশতাক গংদের বাদ দিয়ে ব্যক্তি সমর্থনে ও কৌশলে এগিয়ে যাওয়ার কারণে ৭ নভেম্বর বিপ্লব দিবস হিসেবে সঠিক মূল্যায়ন অনেকের কাছে এখনো বিতর্কিত।
আমি ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও অন্য সহকর্মীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফ্লাইং ক্লাবের একটি চেসনা এয়ারক্র্যাফটে করে রংপুরে আমার ইউনিটে ফিরে যাই। যাওয়ার সময় খালেদ আমাকে বলেছিলেন, ‘রংপুর ব্রিগেড যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে, রংপুরে অবস্থানরত রক্ষীবাহিনীর ইউনিটগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, প্রয়োজনে ইউনিট নিয়ে ঢাকার দিকে আসতে হতে পারে।’ সর্বশেষ বললেন, ‘যশোর ব্রিগেডের দিকে নজর রাখবে এবং ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।’ আমার যুদ্ধকালীন ইউনিট ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইতিমধ্যেই রংপুর থেকে ঢাকায় এসে শেরেবাংলা নগরে অবস্থান করছিল। এই ইউনিট যেহেতু যুদ্ধ চলাকালীন আমার অধিনায়কত্বে ‘কে’ ফোর্সের অধীনে ছিল, সে কারণে এই ইউনিটের ওপর খালেদের আস্থা ছিল অনেক বেশি। ৬ নভেম্বর রাতে ঐ ভয়াবহ পরিস্থিতির সময় খালেদ, রক্ষীবাহিনীর প্রধান নুরুজ্জামান, কর্নেল হায়দার ও কর্নেল হুদা ১০ বেঙ্গলে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে কাঁঠালবাগানে খালেদের এক আত্মীয়ের বাসা হয়ে শেরেবাংলা নগরের দিকে যাত্রা শুরু করেন। আসাদগেট পৌঁছার পর ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান সাভার অভিমুখে চলে যান। বাকি তিন জন ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এসে উপস্থিত হন। সারারাত খালেদ, হুদাদের সঙ্গে জিয়াভক্ত অফিসারদের কথা কাটাকাটি চলছিল। যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানের আর্টিলারি সেলে কপালে আঘাতপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ শান্তভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। তিনি এক বসায় শেষরাত পর্যন্ত প্রায় দুই-তিন প্যাকেট সিগারেট শেষ করলেন। রংপুর থেকে ঢাকায় আসা এই ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সৈনিকদের কোনো বিদ্রোহ ছিল না। মাত্র কিছুসংখ্যক অফিসার ও সৈনিকের মধ্যে ওপরের ইঙ্গিতে কিছুটা উত্তেজনা ছিল। বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র ও ঢাকা সেনানিবাস থেকে কারো যোগসাজশ ছাড়া এই পূর্বপরিকল্পিত নির্মম হত্যাকাণ্ড ভোররাতে সংঘটিত হতে পারে না। বিদ্রোহীদের হাতে যদি খালেদ-হুদা-হায়দার নিহত হতেন, তাহলে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ও ব্যবস্থাপনায় তাদের লাশ ঢাকার সিএমএইচে এনে সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা, তাদের আত্মীয়স্বজনদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় খবর পৌঁছানো হতো; এমনকি কর্নেল হুদার স্ত্রীকে রংপুর থেকে আনার জন্য হেলিকপটার পাঠানো ইত্যাদি ঐ দিন ঐ উত্তেজিত পরিস্থিতিতে সম্ভব হতো না। সেদিন খুব পরিকল্পিতভাবে এ-ও প্রচার করা হয়েছিল, খালেদ ইন্ডিয়ান এজেন্ট ছিলেন এবং তার কাছে ইন্ডিয়ান টাকা পাওয়া গেছে। যা ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট। এই প্রচার শুধু খালেদের বিরুদ্ধে ছিল না, পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও ছিল। অন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি খালেদ, হুদা ও হায়দার হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া উচিত। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য জাতির জানার অধিকার রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনীতির পটপরিবর্তন, ঘটনাপ্রবাহ ও অনেকের জাতীয় রাজনীতিতে আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদি খালেদের নেতৃত্বে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থান না ঘটত তাহলে প্রথমত. মোশতাক গংরা ক্ষমতায় আরও অনেক দিন অধিষ্ঠিত থেকে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করত। এতে আওয়ামী লীগের মধ্যে আরও ভাঙন সৃষ্টি হতো। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী মোশতাকের পক্ষে আসতেন না অথবা তার বিরুদ্ধাচরণ করতেন তাদের জেলজুলুম-নির্যাতন ও প্রহসনের বিচারে ফাঁস, এমনকি গোপন হত্যার শিকার হতে হতো।
দ্বিতীয়ত. জাসদের ৭ নভেম্বরের এই বিদ্রোহ-বিপ্লব অবশ্যই অন্য কোনো সময়ে সংঘটিত হতো। কিন্তু এটা সত্য যে, জাসদ যখনই যার আমলে এই বিপ্লব বা বিদ্রোহ সংঘটিত করত, সেই বিপ্লব ৩ নভেম্বরের প্রেক্ষাপটের সময় ও সুযোগের পরিস্থিতিতে ঘটত না। সে অবস্থায় জাসদ যদি এ ধরনের বিদ্রোহ ও বিপ্লব ঘটাত, সেসময় দেশে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।
তৃতীয়ত. জিয়া হয়তো অন্য কোনো সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতেন। আমার মূল্যায়নে জিয়া সময়মতো মোশতাক থেকে ক্ষমতা নিয়ে নিতেন। সেক্ষেত্রে খালেদের সমর্থন পেতেন জিয়া। কারণ জিয়ার সঙ্গে মোশতাক গংদের সম্পর্কের দিনদিন অবনতি ঘটছিল। জিয়াও একজন তীক্ষ উচ্চাভিলাষী অফিসার হিসেবে সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।
