ট্রেনের কথা মনে উঠলেই যেটা সবার মনে পড়ে তা হলো—পথের দুই ধারের বাড়িঘর, খেতখামার সবকিছুই যেন ট্রেনের সঙ্গে ছুটছে। সত্যজিত্ রায়ের পথের পাঁচালী সিনেমায় অপু আর দুর্গার প্রথম রেলগাড়ি দেখার সেই দৃশ্য নিয়ে গেছে বাঙালিকে অস্কার বিজয়ীতে। দূরে শোনা যাচ্ছে ট্রেনের হুইসেল, ঝমঝম শব্দ—এটা যেন সবারই শৈশবের স্মৃতি। নতুন ট্রেন দেখার আনন্দ এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা! গত ৫ নভেম্বর ২০২৩ চট্টগ্রাম কক্সবাজার রুটের ট্রায়াল ট্রেন দেখতেও অপু আর দুর্গার মতো ছুটে এসেছিল হাজারো মানুষ। কক্সবাজারে স্বপ্নের প্রথম ট্রেন পৌঁছানোর দৃশ্য দেখতে লোকে-লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে এখন ট্রেন ছুটছে। একদিকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে, অন্যদিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম হয়ে সমুদ্রকন্যা কক্সবাজারে। দোহাজারী থেকে অরণ্যঘেরা নিসর্গপথে ছুটে চলছে। সবুজেঘেরা পাহাড়, সম্মুখে সীমাহীন নীল সমুদ্রের হাতছানি। ঘন অরণ্যরাজির মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ। যাত্রীরা চেয়ে দেখবেন চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, বন্যহাতি চলাচলের পথ। ক্রান্তীয় মিশ্র-চিরহরিত্ বনের বনস্পতি শতবর্ষী গর্জন শাল, সেগুন, আকাশমণি, বট, হারগোজা, চাঁপালিশ বৃক্ষরাজি ডাকবে হাতছানি দিয়ে। কল্পনা নয়, এটা এখন বাস্তব! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ করে দেখিয়েছেন ট্রেন কক্সবাজারেও যেতে পারে!
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০৩ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপন এখন উদ্বোধনী পর্যায়ে। পাহাড়ঘেরা এ পথে অত্যাধুনিক ট্যুরিস্ট ট্রেন চলবে। চট্টগ্রাম-রেঙ্গুন রেলপথের পরিকল্পনা করেছিলেন ব্রিটিশরা। পরিকল্পনায় ছিল, আসাম থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করে সেটাকে বার্মা (মিয়ানমার) নিয়ে যাওয়া। এজন্য ১৮৯২ সালে গঠিত হয়েছিল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে। ১৮৯২-১৯৪২ সাল পর্যন্ত এর উদ্যোগে অনেকগুলো রেলপথ তৈরি হয়েছিল। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সালে চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ব্রিটিশরা কক্সবাজার থেকে রামু পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে আর আগ্রহ দেখায়নি। ফলে ব্রিটিশদের এই প্রজেক্টটি পরিত্যক্ত হয়।
দোহাজারী থেকে রেলপথের সম্প্রসারণের এই সাহসিকতার কাজটি দেখান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের সন্নিকটবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতাভুক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত গতিতে কাজ চলতে থাকে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রেলপথের অন্যতম সমস্যা ছিল কালুরঘাট সেতু। এই সেতু দিয়ে ভারী ইঞ্জিনের ট্রেন চলাচল করার ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নকশা অনুযায়ী ১১ এক্সেল লোডের রুটটিকে ১৫ এক্সেল লোড ধারণক্ষমতাসম্পন্ন করা হয়েছে। সরকার বুয়েটের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে সেতুটি এখন রেল চলাচলের জন্য প্রস্তুত করে ফেলেছে।
প্রধানমন্ত্রী গোটা দেশকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে জনগণ তার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে। পশ্চিমাঞ্চলের রেলের উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে যমুনা নদীর ওপর ডাবল লাইনের ৪.৮ কিলোমিটার রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করছে সরকার। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আশা করা যায়, প্রমত্ত যমুনার বুক চিরে নির্মিত দীর্ঘতম বঙ্গবন্ধু রেলসেতু দিয়ে ২০২৪ সালে ট্রেন চলাচল শুরু হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু চালু হওয়ার পর ৮৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এখনকার মতো তখন আর কোনো ট্রেন থামিয়ে প্রমত্ত যমুনা পাড়ি দিতে হবে না। কারণ এটি ডবল লাইনের হওয়ায় একই সঙ্গে একাধিক ট্রেন চলাচল করতে পারবে।
দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় রেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা। রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা অতীতে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল। বিগত সরকারের আমলে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অনেক রেল কর্মচারীকে বিদায় করা হয়েছে। অনেক স্টেশন স্থবির হয়ে যায়। রেল অবহেলিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রেলপথ বিভাগ এবং পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি উপলব্ধি করেন, দেশের প্রত্যন্ত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সাশ্রয়ী মূল্যে যোগাযোগ সুবিধা দেওয়া সম্ভব এবং সেটা রেলের মাধ্যমেই। ১৯৯৬ সালে প্রথম বার ক্ষমতায় এসে তিনি ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতুর ওপর রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সংযুক্ত করে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে রাজশাহী, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নে ৬ষ্ঠ-পঞ্চবার্ষিক (২০১১-২০১৫) পরিকল্পনায় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের সিগন্যালিং ও ইন্টারলিংক ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। ২০০৯ সালের শুরু থেকে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনসহ সর্বমোট ৯২টি নতুন ট্রেন বিভিন্ন রুটে চালু করা হয়েছে এবং ২৪টি ট্রেনের সার্ভিস বর্ধিত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সহায়তায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক ‘মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
শুধু চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ কেন, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষেরও আরেক বার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো গত ১০ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে। এদিন উদ্বোধন করা হয় পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন যাত্রা। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যত্ রেলের কথা বললেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করলেন, ‘আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। আমরা ডুয়েল গেজ, ব্রডগেজ এই ধরনের রেললাইনই তৈরি করে দিচ্ছি, যাতে আমাদের রেল গতিশীল হয়। পণ্য পরিবহন এবং যাত্রী পরিবহনে আরো সক্ষমতা অর্জন করে ভবিষ্যতে আমাদের আরো ৪৬টি নতুন ব্রডগেজ লোকোমোটিভ, ৪৬০টি নতুন ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ, ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ, ১ হাজার ৩১০টি নতুন ওয়াগন সংগ্রহেরও উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। আমরা আশা করি তিন-চার বছরের মধ্যে সারা বাংলাদেশে রেলওয়ে যোগাযোগ আরো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। মানুষের জীবনমান আরো উন্নত হবে। এই পদ্মা সেতু দিয়ে রেললাইন চলে যাবে ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত।’
দীর্ঘদিন অবহেলিত অবস্থা থেকে এর উত্তরণ ঘটানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অল্প খরচে পণ্য পরিবহন এবং মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি বাংলাদেশের সমগ্র জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করছেন। কক্সবাজারও তার ব্যতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলের পরিত্যক্ত রেলপথকে তিনি নতুন করে প্রাণের স্রার দিলেন। এতে করে দীর্ঘদিনের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ দক্ষিণ পূর্ব বাংলার জনপদের মানুষের জীবনধারাই শুধু পালটাবে না, যোগাযোগ,আয়, এমনকি জিডিপিতেও আয় বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। জাতীয় যোগাযোগ অবকাঠামোতে চিহ্নিত হয়ে থাকবে একটি মাইলফলক হিসেবে।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
