এই ছবির বেশিরভাগ শিশুই আর বেঁচে নেই

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৩, ১২:০৩

চার বছর আগে গাজায় নিজ বাড়িতে ছবিটি তুলেছিলেন আহমেদ আল নাওক। দিনটি ছিল শুক্রবারের রৌদ্রজ্জ্বল, অলস বিকেল। জলপাই গাছের ছায়ায় পরিবারের বাচ্চাদের ছুটোছুটিতে মুখরিত ছিল বাড়ির উঠান। বাচ্চাদের খাওয়াতে, গল্প করতে তাদের সঙ্গে ছিলেন নাওক ও তার ভাই-বোনেরা। বাচ্চাদের সঙ্গে এই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন নাওক। এখন এসব কেবলই স্মৃতি।

ছবিতে থাকা সাতজন শিশুই এখন বেঁচে নেই। মারা গেছে ছবির বাইরে থাকা কয়েকজন শিশু। মৃতদের মধ্যে এমন ছোট শিশুও আছে, চার বছর আগের এই দিনে যাদের জন্ম হয়নি। গত ২২ অক্টোবর ইসরায়েলি বিমান হামলায় মারা গেছে নাওকের পরিবারের মা বাবা ভাই বোন শিশুসহ ২১ জন। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি, ১৪ জন। কর্মসূত্রে চার বছর আগে যুক্তরাজ্য পাড়ি দেওয়ায় জীবিত আছেন নাওক।

নাওকদের বাড়িটি ছিল গাজার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র দেইর-আল-বালাহ শহরে। তাদের বাবার বানানো এই বাড়িতে ছেলে-মেয়েসহ বসবাস করতেন দুই বড় ভাই। যুদ্ধের শুরুর দিকেই  বোন আয়ার বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই সন্তানসহ বাবার বাড়িতে এসে উঠেছিলেন আয়া নিজেও। এমন খারাপ পরিস্থিতিতে আরও দুই বোন ওয়ালা এবং আলাও সন্তানসহ থাকছিলেন এই বাড়িতে। নাওক এবং তার পরিবার ভেবেছিল দেইর-আল-বালাহ এলাকাটি নিরাপদ। কারণ তখন পর্যন্ত এই এলাকায় কখনো হামলা হয়নি। ২২ অক্টোবর তাদের বাড়ির ওপর দিয়ে বিমান হামলা হয়। নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায় তাদের পরিবার। ঘটনার পর নিজে কেনো আরও সতর্ক হলেন না, এখন নিজেকেই দোষারোপ করছে নাওক।

বোমা হামলার ঘটনার পর মারা যাওয়া শিশুদের ছবি আলাদাভাবে অনলাইনে পোস্ট করে ঘটনার আদ্যপান্ত লিখেছেন নাওক। তাদের সঙ্গে কতটা নৃশংস ঘটনা ঘটেছে বিশ্বকে জানাতে চান তিনি।

নাওকের সবচেয়ে বড় ভাগ্নে ছিল এসলাম (১৩)। এসলামকে নাওক নিজে কোলেপিঠে বড় করেছিলেন। বড় হয়ে সেও মামার মত মেধাবী, ক্লাস সেরা হতে চেয়েছিল। এসলাম ছাড়াও মারা গেছে দিমা(১০), তালা (৯), নুর (৫), নাসমা (২), রাগাদ (১৩) বকর (১১), সারা (৯), মোহাম্মদ (৮), বাসেমা (৮), আব্দুল্লাহ (৬), তামিমসহ (৬) পরিবারের অন্য সদস্যরা।

হামলার দিন ভাতিজা ওমর (৩) ঘুমিয়ে ছিল বাবা মায়ের সঙ্গে। হামলার পর নাওকের এক বোন ফোনে জানান, ভাই মুহাম্মদ মারা গেছে। ওমর ও তার মা সীমা বেঁচে আছে। দুঃখের ভিতর এটাই ছিল করুণ সুখের খবর।

হামলায়  ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছিল শিশু মালাক (১১)। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করার পর নাওক তার সঙ্গে কথা বলেন। হামলার এক সপ্তাহ পর গাজার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুই দিন পর নাওক যখন আবার যোগাযোগ করেন তখন মালাকও মৃত। মালাকের চিকিৎসাধীন হাসপাতালে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে মালাক।

গত ৭ অক্টোবর থেকেই ফিলিস্তিনিদের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ১১ হাজার ফিলিস্তিনি মারা গেছে।

ইত্তেফাক/টিটি/এসএটি