চাঁদাবাজির ১০ কোটি টাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের তিনটি গ্রুপ এখন মুখোমুখি। এরই মধ্যে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক বৈঠকে গ্রুপগুলোর মধ্যে ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গুলির শব্দ ও আতঙ্কে এক জন হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাইপাস সার্জারি করেন চিকিৎসকরা। ঐ ঘটনার জের ধরে গত বুধবার রাতে গুলশান শপিং সেন্টারের সামনে এক গ্রুপ প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে আফজাল মোল্লা নামে এক ব্যক্তি ছুরিকাহত হন। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত আফজাল মোল্লা গুলশান থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জাকির হোসেন ২১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক জন কর্মকর্তা জানান, আমেরিকায় অবস্থানকারী মেহেদী বাড্ডা, গুলশান, বনানী ও ভাটারা এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৫ বছরে মেহেদী গ্রুপের হাতে এই এলাকায় ১৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। খুনের শিকার সবাই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। মেহেদী গ্রুপের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা হলেন দুলাল, ময়লা সাঈদ, মান্নান, তাহের, মহারাজ, সোলেমান শাহীন, মানিক, মোরসালিন, পুলক, ইমরান, সাইফুল, লালন, সজল, ইমরান, কানি সাহেলসহ ৩০ জন। এদের অনেকের বিরুদ্ধে গুলশান, বাড্ডা ও ভাটারা থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। মেহেদী গ্রুপের সঙ্গে মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী ডালিম-রবিন গ্রুপের সখ্য রয়েছে।
এর আগে ২৮ অক্টোবর বাড্ডা গুদারাঘাট এলাকায় যুবলীগের ২১ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ে গুলশান শপিং সেন্টার নির্মাণকাজের ১০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মেহেদী গ্রুপ, জিসান গ্রুপ ও চঞ্চল গ্রুপের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাত ১০টার দিকে এ বৈঠক চলাকালে তিন গ্রুপের মধ্যে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। এক পর্যায়ে সেখানে তিন গ্রুপের ক্যাডারদের ফাঁকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ সময়ে ২৫/৩০টি গুলি ছোড়া হয়। ঐ সময় বৈঠকে উপস্থিত ২১ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি জাকির হোসেন গুলির শব্দে হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে ইউনাইটেড হাসপাতালে রাতেই তার বাইপাস সার্জারি করেন চিকিৎসকরা।
গুলশান-১ নম্বর গোলচক্করে গুলশান শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণকে কেন্দ্র করে আমেরিকায় আত্মগোপন করা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ওরফে চঞ্চল গ্রুপের ক্যাডার বাহিনী মহড়া দিচ্ছে। চাঁদাবাজির টাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চঞ্চল গ্রুপ মেহেদী গ্রুপের সঙ্গে অনেকটা হাত মেলালেও ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান গ্রুপের সঙ্গে কোনো ‘নিগোসিয়েশন’ হয়নি বলে এক জন জানিয়েছেন। বর্তমানে জিসান দুবাইয়ে আত্মগোপন করে গুলশান এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। জিসানের বিরুদ্ধে ২০০২ সালে মালিবাগে সানরাইজ হোটেলে দুই পুলিশ কর্মকর্তা খুন, মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যাসহ প্রায় ১৫টি মামলা রয়েছে। গুলশান এলাকায় জিসানের চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে বাদশা-জাকির গ্রুপ।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালে গুলশানে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিলকীকে হত্যার ঘটনায় যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল আমেরিকায় আত্মগোপন করেন। আমেরিকা থেকেই তিনি গুলশান ও মতিঝিলের চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। চঞ্চল গ্রুপের অলি, বাবুল, স্বপন ও মিলকী সোহেল গুলশান এলাকায় গুলশান শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের চাঁদাবাজির ১০ কোটি টাকার ৫ কোটি টাকা দাবি করেছেন।
এদিকে ২৮ অক্টোবরের ঘটনার জের ধরে গত বুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে গুলশান-১ নম্বর গোলচক্করে ডিসিসি মার্কেটের সামনে মেহেদী গ্রুপ ও জিসান গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে আলোচনার এক পর্যায়ে দুলাল, ময়লা সাঈদ, ইমরান, সাইফুল, লালন, সজল, ইমরান, মিলকী সোহেলসহ ৮-১০ জন আফজাল মোল্লার ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। আফজাল মোল্লা গুলশান থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শনিবার আফজাল মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সুস্থ হওয়ার পর এ ব্যাপারে আমি মামলা করব।’ হামলাকারীরা কোন গ্রুপের সদস্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মামলায় বিষয়টি উল্লেখ করব।’
এ ব্যাপারে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (সদ্যপদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি) শহীদুল্লাহ বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। মামলা দায়ের হলে বিস্তারিত বলা যাবে।
এক জন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান-মেহেদী-চঞ্চল গ্রুপ এখন গুলশান এলাকাটিকে চাঁদাবাজির নিরাপদ জোন মনে করছে। এই এলাকার ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন মার্কেট ও ভবনগুলোতে চাঁদাবাজি করা যায় অনেকটা নীরবে। অভিজাত এলাকা বলে অনেক ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রতিবাদ করেন না। এ কারণেই গুলশান এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হচ্ছে।

