ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইলের আগ্রাসন চলছে। চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হাজারো শিশু। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলটিতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরো ১৫ হাজার শিশু জন্ম নেবে। মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। এদিকে ইসরাইল আল-শিফায় অভিযান চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। আনাদোলু এজেন্সি এই খবর প্রকাশ করেছে। রয়টার্স, বিবিসি
মানবাধিকার সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, জীবনের এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ গাজায় আরো ১৫ হাজার শিশু জন্ম নিতে যাচ্ছে। এসব শিশুর সবাই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে গুরুতর ঝুঁকিতে এবং ‘চিকিত্সাসেবা, খাবার পানিসহ খাদ্যসংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, সন্তান জন্মদানকারীদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ নারী প্রসবকালীন বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। জাতিসংঘের মতে, অবরুদ্ধ গাজায় প্রতিদিন প্রায় ১৮০ নারী সন্তান প্রসব করেন। ঐ বিবৃতিতে গাজায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সেখানে পর্যাপ্ত খাবার পানির সংকট, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব রয়েছে। স্তন্যদানকারী নারীরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না। এর মধ্যে তীব্র সংকটের সম্মুখীন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হয়েছে। যা অন্তঃসত্ত্বা এবং নবজাতকসহ হাজার হাজার রোগীকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়েছে। গাজা উপত্যকায় সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মী মাহা শিফা হাসপাতালের বাইরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাকে অঞ্চলটির দক্ষিণাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়। হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালের অবস্থা ভয়ংকর ছিল। বারান্দায় অন্তঃসত্ত্বা নারীরা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। ইনকিউবেটরে অজ্ঞাত নবজাতক শিশু। যার পরিবারের কোনো সদস্যই জীবিত নেই। হাসপাতালে জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে। আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হই। আমি জানি না তারা বেঁচে আছে কি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, গাজার মোট ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে ২২টিই এখন ‘অকার্যকর’। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর জেসন লি বলেন, একটি মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে শিশুরা। এ যেন এক দুঃস্বপ্ন। তাদের পরিবারগুলো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। চিকিত্সাসেবা ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন নারীরা। নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুরা ইনকিউবেটরেই মারা যাচ্ছে।
এ সময় জেনারেটরগুলোকে সচল করতে গাজায় জ্বালানি প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখার দাবি জানান তিনি। জেসন বলেন, এ সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। আমাদের যুদ্ধবিরতি দরকার এবং তা এখনই দরকার। ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের আকস্মিক হামলার পর থেকেই গাজা উপত্যকায় নির্বিচারে বিমান ও স্থল হামলা শুরু করেছে ইসরাইল।
এদিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাই আল-কাইলা বলেছেন, গাজার আল-শিফা হাসপাতালে সামরিক অভিযান চালানোর মাধ্যমে ইসরাইল ‘মানবতাবিরোধী নতুন অপরাধ’ করছে। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএফএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কাইলা বলেন, আল-শিফার চিকিত্সাকর্মী, রোগী ও সেখানে থাকা উদ্বাস্তুদের জীবনের জন্য দখলদার বাহিনী সম্পূর্ণ দায়ী বলে ধরব আমরা।
আল-শিফা ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজার বৃহত্তম হাসপাতাল। এই হাসপাতালটিতে ৬৫০ জনের মতো রোগী, ২০০ থেকে ৫০০ কর্মী ও আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় হাজার বেসামরিক ফিলিস্তিনি আছে বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই হাসপাতালের নিচে, ভূগর্ভে হামাসের একটি কমান্ড সেন্টার আছে বলে অভিযোগ করেছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।কিন্তু নিজেদের অভিযোগে অটল ইসরাইল বুধবার ভোররাত থেকে এই হাসপাতালটিতে ঝটিকা অভিযান শুরু করে ‘হাসপাতালের নিচে টানেলে থাকা হামাস যোদ্ধাদের’ আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে কয়েকদিন ধরে আল-শিফা হাসপাতাল অবরুদ্ধ করে রাখে ইসরাইল। তারা সেখান থেকে কাউকে বের হতে দিচ্ছে না। বিদ্যুত্ ও জ্বালানিবিহীন হাসপাতালটিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। বিদ্যুত্ না থাকায় কয়েক ডজন নবজাতককে তাদের ইনকিউবেটর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এদের সবার মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে ইতিমধ্যে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতালের ম্যানেজার জানিয়েছেন। কিন্তু মৃত রোগীদের বাইরে নেওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালেই মৃতদেহের স্তূপ জমে আছে। লাশগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাধ্য হয়ে মৃতদের সমাহিত করতে হাসপাতালের ভেতরেই গণকবর খোঁড়া হচ্ছিল। এর মধ্যেই সেখানে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তুদের মধ্যে হামাস যোদ্ধারা আছে আর হাসপাতালের নিচে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটির কমান্ড সেন্টার আছে অভিযোগ করে সেখানে অভিযান শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হাসপাতালের ভেতরে ছয়টি ইসরাইলি ট্যাংক অবস্থান নিয়েছে এবং শতাধিক সেনা জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে। কিছু সেনা মাস্ক পরা আর তারা আরবিতে চিত্কার করে বলছিল, ‘কেউ নড়চড়া করবেন না, নড়াচড়া করবেন না’। সেনারা হাসপাতালের ভেতরে স্মোক বোমা নিক্ষেপ করে বলেও জানান তিনি।
