স্বপ্নের মতো বললেও যেন কম বলা হয়। এবারের বিশ্বকাপে বল হাতে যে অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করে চলেছেন মোহাম্মেদ শামি, তার সত্যিকার মাহাত্ম্য ফুটিয়ে তোলার কোনো বিশেষণই যেন যথার্থ নয়! এ পর্যন্ত মাত্র ৬ ম্যাচ খেলেই ২৩ উইকেট শিকার করেছেন ভারতীয় পেসার। বনে গেছেন এবারের বিশ্ব্বকাপে এখনও পর্যন্ত (গতকাল অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত) সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক।
৬ ম্যাচে ২৩ উইকেট শিকার করাটা অবিশ্বাস্য। এই কীর্তি গড়ার পথে ৩৩ বছর বয়সি শামি নিজের সত্যিকার বোলিং কারিশমাটা দেখিয়েছেন গত পরশু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে। ৩৯৮ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নামা নিউজিল্যান্ডকে ৩২৭ রানে থামিয়ে দেওয়ার পথে ৯.৫ ওভারে ৫৭ রান দিয়ে নিয়েছেন ৭ উইকেট। তাতে একদিকে নিজ দল ভারতকে যেমন ৭০ রানের জয় উপহার দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন, পাশাপাশি নিজে গড়েছেন একগাদা বোলিং রেকর্ড-কীর্তি।
ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়েছেন শামি। এর আগে ওয়ানডেতে ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সেরা বোলিং কীর্তিটা ছিল স্টুয়ার্ট বিনির দখলে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে মিরপুরে মাত্র ৪ রান দিয়ে ৬ উইকেট দখলের অবিশ্বাস্য জাদু দেখিয়েছিলেন তিনি।
শুধু দেশের হয়ে ওয়ানডেতে সেরা বোলিং রেকর্ডই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসেই নকআউট পর্বের ম্যাচে প্রথম বোলার হিসেবে ৭ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডও গড়েছেন। সব মিলিয়েই ওয়ানডে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচে কোনো বোলারের ৭ উইকেট নেওয়ার দ্বিতীয় ঘটনা এটা। এর আগের একমাত্র কীর্তিটা গড়েছেন পাকিস্তানের সাবেক পেসার আকিব জাভেদ। ১৯৯১ সালে ভারতের বিপক্ষে উইলস ট্রফির ফাইনালে ৩৭ রান খরচায় ৭ উইকেট নিয়েছিলেন আকিব।
এই নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো ম্যাচে ৫ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখালেন শামি। এক বিশ্বকাপে কোনো বোলারের সবচেয়ে বেশি বার ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড এটাই।
সব মিলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব চেয়ে বেশি (৪ বার) ৫ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়লেন। এর আগে ২০১৯ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন শামি। এক্ষেত্রে শামি পেছনে ফেলে দিয়েছেন অস্ট্রেলীয় পেসার মিচেল স্টার্ককে। তিনি মোট তিনবার ৫ কিংবা তারও বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন।
সব মিলে বিশ্বকাপে মোট ১৭ ম্যাচেই ৫৪ উইকেটের মালিক এখন শামি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে ৫০ উইকেটের মাইলফলক পেরোলেন। এখানেও শামি ভেঙে দিয়েছেন স্টার্কের রেকর্ড। স্টার্ক ৫০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন ১৯তম ম্যাচে।
পরশুর রেকর্ড গড়া ৭ উইকেটের মাধ্যমে শামি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট-শিকারিদের তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছেন। ফাইনালে তিনটি উইকেট নিতে পারলেই ওয়াসিম আকরাম (৫৫ উইকেট) ও লাসিথ মালিঙ্গাকে (৫৬ উইকেট) টপকে জায়গা করে নিতে পারবেন ৪ নম্বরে।
দলে থাকলেও এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম চারটি ম্যাচেই দর্শক হয়ে থাকতে হয় শামিকে। অবশেষে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের পঞ্চম ম্যাচে শামিকে একাদশে নেয় ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। সেই ম্যাচেই ৫৪ রান খরচায় ৫ উইকেট তুলে নিয়ে শামি জানিয়ে দেন, এবারের বিশ্বকাপটা হবে তার! পরশু সেই নিউজিল্যান্ডকেই দ্বিতীয় বার সামনে পেয়ে ধারণ করেন আরো ভয়ংকর রূপ। মাঝে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও ৫ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেন ২ উইকেট। ৬ ম্যাচের মধ্যে শামি উইকেট পাননি শুধু নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। ডাচরা তাহলে ভয়ংকর শামিকে নিয়ে ভালোমতোই গবেষণা করে নেমেছিলেন!
