বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

রোহিঙ্গা শিবিরেও নীতি পুলিশ! অধিকার থেকে বঞ্চিত নারী-শিশুরা

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৩, ১৯:৪৭

নিজ দেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। এরপর সময়ের ব্যবধানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাদের দুর্ভোগ আর দুর্দশার চিত্র। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুসারে ৫ বছরে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে শিবিরগুলোতে। পরিবার পরিকল্পনার অভাবে প্রায় নিয়মিতই শত শত রোহিঙ্গার শিশুরও জন্ম হচ্ছে যা বাংলাদেশ সরকারের জন্য যেমন উদ্বেগের তেমনি শিশুদের জন্যেও ঝুঁকিপূর্ণ।

শান্তির স্বপ্ন দেখে রোহিঙ্গা শিশু মরিয়ম

মরিয়ম তার পরিবারের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারের একটি শিবিরে। সে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এখানে এসে আর পড়ার সুযোগ পাচ্ছেনা। শিবিরের এই পরিবেশেও সে হাঁপিয়ে উঠেছে। সে চায় একটি সুন্দর ভবিষ্যত যেখানে সে পড়াশোনা করতে পারবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারবে আর বড় হয়ে একজন ডাক্তার হবে। 

মরিয়ম বলেছে, এখানে আমাদের নিরাপত্তা নেই। অপহরণ আর যৌন হয়রানির ভয় সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। ঘরের বাইরে যেতে পারিনা। একটি মাত্র টয়লেট সবাই মিলে ব্যবহার করি। একসঙ্গে অনেকজন ঘুমাই। আমার এখানে ভালো লাগছে না। আমি বাড়ি ফিরতে চাই। আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চাই।

আড়ালে চলছে নীতি পুলিশিং

মিয়ানমারের জাতিগত সংখ্যালঘু এই মুসলিম সম্প্রদায়ে নারীদের মানতে হয় কঠোর নিয়ম কানুন। ইরানের নীতি পুলিশের মতো এখানে কাজ করছে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা)। তারা এখানকার প্রায় ৩৮টি শিবিরের মধ্যে থাকা উগ্রপন্থীদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ও দুর্ধর্ষ। নারীদের কঠোর পর্দা মেনে চলতে বাধ্য করার পাশাপাশি শিশু অপরহরণের মতো নিকৃষ্ট কাজেও জড়িত তারা।

নারীদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আরসার সদস্য বলেন, ‘প্রথমে আমরা মেয়েদের পর্দা করতে বলি। না শুনলে মারধর করি। নারীদের স্বামীসহ তুলে এনে মারধর করি। তবে জানে মেরে ফেলিনা। শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দেই। এরপর তারা ভয় পায়। ঘর থেকে বের হয়না। কোনো কাজেও যায়না নারীরা।’

ছবি: সংগৃহীত

শিবিরে নারীদের পর্দার মতো বিধিনিষেধ মেনে চলার পরিবেশ প্রসঙ্গে প্রায় ১৬ হাজার মানুষের একটি শিবিরের নির্বাচিত চেয়ার ওমেন রামিদা বেগম বলেন, ‘এখানে একসঙ্গে গাদাগাদি করে অনেকজনকে থাকতে হয়। দেখা যায় এক পরিবারের ৭/৮ জনের জন্য মাত্র একটি টয়লেট। নারী-পুরুষ সকলে এক টয়লেট ব্যবহার করে। এই পরিবেশে বাইরে বের হলে পর্দা ঠিক রাখা সম্ভব হয়না। ঘর থেকে বের হলে মানুষ দেখবেই।’

সন্ধ্যার পর শিবিরে নামে আতঙ্ক, ঘটে ধর্ষণের মতো ঘটনা

রামিদা বেগম জানান, সন্ধ্যা নামতেই শিবিরের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। টয়েলেটে যাওয়ার সময় যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয় নারী, শিশুরা। এছাড়াও শিবিরে বাল্যবিবাহ স্বাভাবিক ঘটনা। বিকেল ৫টার পর শিবিরে বাইরের কারও প্রবেশের অনুমতি নেই।

নারী ও শিশুরা অধিকার থেকে বঞ্চিত

রোহিঙ্গা শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের অনুমতি সকলের থাকলেও এরপর তারা আর শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়না। বিশেষ করে ১০/১২ বছরের মেয়ে শিশুদের ঘর থেকেই বের হওয়া বারণ। কারণ এই সময় অনেকের পিরিয়ড শুরু হয়ে যায়। বর্তমানে শিবিরে অনুদানের অভাবে প্রায় থমকে আছে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম। ফলে পর্যাপ্ত মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। বাল্যবিবাহ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর পুষ্টিকর খাবারের অভাবে ভুগছেন রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গা শিশু। ছবি: ইউনিসেফ

বাড়ছে শিশু অপহরণ ও চাঁদাবাজি

রোহিঙ্গা শিবিরে অপহরণ ও চাঁদাবাজি বাড়ছে রোজ। সম্প্রতি এক রোহিঙ্গা নারীর ছেলেকে দ্বিতীয়বারের মতো অপরহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, অপহরণকারী তাকে ফোন করে ২ লাখ টাকা দাবি করেছে। বিকাশের মাধ্যমে এই টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। টাকা না দিলে তার সন্তানকে মেরে ফেলা হবে বলেও হুমকি দিয়েছে অপহরণকারীরা।

তবে অপহরণকারীদের নাম বলতে চাননা ভুক্তভোগীরা। এসব যে উগ্রপন্থীদের কাজ তা আর বুঝতে বাকি নেই। এসব উগ্রপন্থীদের ভয়ে সবসময় তটস্থ থাকতে হয় শিবিরের নারী ও শিশুদের।

শিশুদের পড়াতে গিয়ে হয়রানির শিকার

মিয়ানমারে ভাল মানের পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন শাহিদা উইন নামের এক নারী (৩০)। তার অর্জিত জ্ঞান সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এমন উদ্যোগের পর তার ওপর নিয়মিত হামলা, হয়রানি চলতেই থাকে। তার ঘরে ঢিল মারা, তাকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া এসব কাজ চলছে নিয়মিত। তবুও তিনি দমে যাননি। শিবিরে রোহিঙ্গা নারীদের জীবন নিয়ে বই লিখছেন তিনি। লড়াইটা করছেন কলম দিয়ে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী এই শিবিরে মানবেতর, অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাপন করছে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা। স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ, টয়লেট ও পানির সুব্যবস্থা, প্রাথমিক শিক্ষা, নিরাপদ খাবার, কিশোরিদের সুস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের অভাবসহ নানা সমস্যায় দিন পার করছেন শিবিরের বাসিন্দারা। প্রতিনিয়ত যেসব শিশু জন্ম নিচ্ছে তারা জন্মগতভাবে এক অসুস্থ পরিবেশ পাচ্ছে যেখানে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষেই টিকে থাকা কঠিনতর।

পিরিয়ড চলাকালীন মেয়েরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা পাচ্ছেনা। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা রোগে ভুগছে তারা। বাংলাদেশ সরকার তাদের জোর পূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠাবে না বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাদের ফেরত নিতেও অনিচ্ছার কথা জানিয়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার।

ইত্তেফাক/এবি