বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

৭ দিনের কথা বলে ৭ বছর কলেজে পুলিশ ক্যাম্প

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৩, ২১:৪২

এলাকার বিশেষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি মোড়ে জেলার একমাত্র স্বতন্ত্র বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে সাত দিনের মৌখিক অনুমতি নিয়ে ৭ বছর যাবৎ রয়ে গেছে কদমবাড়ী অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। 

শুধু তাই নয়-পুলিশ দখল করে নিয়েছে অধ্যক্ষের কক্ষটিও। এবং অধ্যক্ষের ছোট্র ওই কক্ষটিতে অস্থায়ী ক্যাম্পের ৯ পুলিশ সদস্য গাদাগাদি করে মানবেতরভাবে জীবনযাপনে দায়িত্ব পালন করে আসছে। আর কলেজ ভবনে পুলিশ থাকার কারণেই ছাত্র/ছাত্রী ভর্তি হতে চায় না। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ধ্বংস প্রায় কলেজটি নাম মুছে যাবে চিরতরের মতো। 

পুলিশের ভাষ্য, শিক্ষার্থী না থাকার কারণে ক্যাম্পটি এখনো রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও স্থানীয়দের দাবি পুলিশ থাকার কারণেই শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না। ফলে এ জটিলতার কারণে একেএকে অনেক শিক্ষকই অন্যত্র চলে গেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের সবেধন নীলমনি অধ্যক্ষ প্রবীণ মণ্ডল একাই সবকিছু সামলাচ্ছেন। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও জেলার শিক্ষা দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে ধন্যা দিয়েও এত বছরে মেলেনি এ সমস্যার সমাধান।

জানা যায়, প্রান্তিক জনপদের শিক্ষা উন্নয়নে উপজেলার দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তে কদমবাড়ী ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দিতে দুই ভাইয়ের (আনন্দ সেন ও গোবিন্দ সেন) দানকৃত এক একর জায়গার ওপর ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় পল্লিশ্রী টেকনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ। শুরুতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে কলেজটি। একসময় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল কলেজটিতে, ছিল হোস্টেলও। বেশ সুনাম কুড়িয়ে কারিগরি শিক্ষায় অবদান রাখতে শুরু করে কলেজটি। ২০১৬ সালের শেষের দিকে স্থানীয় রাজনীতির কারণে প্রভাবশালী দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। দু’পক্ষের ওই সংঘাত ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তখন পুলিশদের থাকার ব্যবস্থা করতে তৎক্ষণাত কলেজটিকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কলেজের অধ্যক্ষকে বলা হয় চলমান সংকট নিরসনে আপনার কলেজে পুলিশ সদস্যদের এক সপ্তাহ থাকার ব্যবস্থা করে দিন। সেই থেকে (১৬ নভেম্বর ২০১৬) কলেজে স্থাপন করা হয় পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। তবে এখন আর সেই সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ নেই। তারপরেও এলাকার কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থে দুঃস্থ ও স্বল্প আয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন নষ্ট করে দিয়ে ক্যাম্পটিকে অন্যত্র না সরিয়ে কলেজেই রেখে দিয়েছেন। আর বিপুল পরিমাণ  বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ায় কলেজের বিদ্যুৎ লাইনটিও কেটে দিয়েছে বিদ্যুৎ অফিস।

কলেজ কতৃপক্ষ জানায়, বহু চেষ্টা করেও পুলিশ ক্যাম্প সরাতে পারেনি। পুলিশ সদস্য থাকার কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা বিশেষ করে ছাত্রীরা স্বাভাবিকভাবে চলা ফেরা করতে পারে না। নেই কোনো শিক্ষার পরিবেশ। এ কারণে ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ জনে। পুলিশ ক্যাম্পটি অন্যত্র সরিয়ে না নিলে এ শিক্ষা প্রতিাষ্ঠানটির শিক্ষার আলো একেবারেই নিভে যাবে আশংকা রয়েছে। কলেজটিতে সেই আগের পরিবেশ থাকলে এতদিনে কলেজটি এমপিওভুক্ত বা জাতীয়করণের আওতায় চলে যেত বলে তাদের বিশ্বাস।  

টুম্পা নামে এক শিক্ষার্থী জানায়, কলেজে ক্লাস করার মতো কোনো পরিবেশ নাই। পুলিশ সদস্যরা ঘোরাফেরা করে। মেয়েদেরকে শুনতে হয় বিভিন্ন ধরনের কথা। কলেজে শিক্ষার পরিবেশ করে দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রভাবশালী ব্যক্তি জানান, এখন আর পুলিশ ক্যাম্পটি রাখার প্রয়োজন নেই। কদমবাড়ী এলাকায় এখন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। 

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রবীণ মণ্ডল বলেন, এক সপ্তাহের কথা বলে কলেজে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সাত বছর হয়ে গেলেও ক্যাম্প সরানোর নাম নেই। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। অনুকূল পরিবেশ না থাকার কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। কলেজটি এখন ধবংসের পথে। সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় দাবি জানাই। 

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক ) সভাপতি ইয়াকুব খান শিশির বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। তাদের জন্য অন্য কোনো জায়গার ব্যবস্থা করা যেতে পারতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি যেন ধ্বংস হয়ে না যায় তার জন্য প্রশাসনের সচেতন হওয়া উচিৎ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
 
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিবচর ও রাজৈর সার্কেল) রাব্বি হোসেন বলেন, তিনি ক্যাম্পটি পরিদর্শন করেছেন। কলেজটিতে শিক্ষার্থী না থাকায় ক্যাম্প এত দিন রাখা হয়েছে। ক্যাম্প সরানোর সিদ্ধান্ত নিতে যথাযথ কতৃপক্ষর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান দেওয়া হবে।

রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উপমা ফারিসা বলেন, তিনি এ কর্মস্থলে নতুন যোগদান করেছে।   তবে ঘটনা জেনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, কোনো লিখিত অভিযোগ তার হাতে আসেনি। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে কলেজ কতৃপক্ষের আপত্তি আছে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকার মানুষের বা শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হোক তা তারা চান না।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মারুফুর শীদ খান বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি যোগদানের পরে কেউ বিষয়টি নিয়ে তার কাছে আসেনি। কলেজ কতৃপক্ষ তার কাছে সহযোগিতা চাইলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিবেন।

ইত্তেফাক/পিও