এ বছর আমাদের পৃথিবী নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বনেতারা কীভাবে সাড়া দেবেন? আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞরা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের (কপ২৮) জন্য বর্তমানে দুবাইতে আবস্থান করছেন। সেখানে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আলোচনা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছেন। ভবিষ্যতে জলবায়ুসংকট মোকাবিলায় বিশ্ববাসীর প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞদের অভিমত উপস্থাপন করা হলো :
জলবায়ু সমস্যা সমাধানের জন্য
৩০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল
মাহমুদ আবুয়েলনাগা
গত শুক্রবার, কপ২৮-এর আয়োজক সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সমস্যার সমাধান করতে এবং গ্লোবাল সাউথে জলবায়ু বিনিয়োগ প্রবাহ সহজ করতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিল চালু করেছে। নতুন জলবায়ু তহবিল ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫০ বিলিয়ন ডলারে বর্ধিত করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ, যা তহবিল ‘অলটেরা’ নামে পরিচিত। এটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল, যা জলবায়ুসংকট মোকাবিলার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
অলটেরাকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহত্ এবং ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ক্ষুদ্র তহবিলে বিভক্ত করা হবে। একটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে, অন্যটি গ্লোবাল সাউথে বিনিয়োগ প্রবাহকে উত্সাহিত করার জন্য ব্যবহার করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করার জন্য ক্ষয়ক্ষতিবিষয়ক তহবিল চালু করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো সম্মত হওয়ার পর এ ব্যাপারে আলোচনা করা হয়। যদিও এর আগে দরিদ্র দেশগুলোতে জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলার জন্য ৪২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছিল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সংকট মোকাবিলায় এই অর্থ যথেষ্ট ছিল না। উক্ত সমস্যা সমাধানে নতুন বেসরকারি তহবিল সম্ভাবনাময় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নতুন জলবায়ু তহবিলের সঠিক ব্যবহারের জন্য একটি স্বচ্ছ কাঠামোর প্রয়োজন হবে, যাতে এটি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সমস্যা সমাধানে দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করতে পারে।
লেখক: আটলান্টিক কাউন্সিলের জিওটেক সেন্টারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড এনার্জি
সলিউশনে কার্বন ব্যবস্থাপনা পোর্টফোলিওর পরিচালক
বিশ্বনেতৃবৃন্দ কি তাদের কথা রাখতে পারবেন?
ল্যান্ডন ডেরেন্টজ
এক বছরের শ্রমসাধ্য আলোচনা ও বিতর্কের পর কপ২৮ সফলতার সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছে। কারণ কপ২৮-এর প্রথম দিনে, কপ২৭-এ ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকে সাহায্য করার জন্য ৪২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জার্মানি ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
উক্ত তহবিলের প্রতিশ্রুতি ইঙ্গিত দেয় যে প্রকৃত আনুষ্ঠানিক আলোচনা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ইতিমধ্যে সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছে। যদিও এই পরিমাণ অর্থ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়, তবু উক্ত তহবিল ভবিষ্যতে দরিদ্র দেশগুলোকে জলবায়ুসংকট কাটিয়ে উঠতে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ। এই উদ্যোগ জলবায়ুসংকট মোকাবিলায় আশানুরূপ ভূমিকা পালন করলে ভবিষ্যতে অন্যান্য উন্নত দেশও অর্থায়ন করতে উত্সাহী হয়ে উঠবে। এ পর্যন্ত যতগুলো জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত চলমান সম্মেলনটিকেই সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় বলে মনে করা হচ্ছে।
লেখক :আটলান্টিক কাউন্সিল গ্লোবাল এনার্জি সেন্টারে
গ্লোবাল এনার্জি সিকিউরিটির সিনিয়র ডিরেক্টর
শুরুতেই সফলতা উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়
সাবরিনা নেগেল
কপ২৮-এর প্রথম দিনটি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। গত বছর কপ২৭-এ ঘোষিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বাস্তবায়ন করতে অংশগ্রহণকারী সব দেশ সম্মত হয়েছে। যদিও দেশগুলো কপ২৭-এ এমন একটি তহবিল গঠন করতে সম্মত হয়েছিল, তবে তহবিলটি কোথায় থাকবে এবং উন্নত দেশগুলো কত টাকা অনুদান দেবে, তা স্পষ্ট ছিল না বিধায় শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে কি না, সে বিষয়ে সবাই সন্দিহান ছিল।
এখন এই নতুন ঘোষণার সঙ্গে দেশগুলো তহবিল গঠনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জার্মানি প্রত্যেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার করে অনুদান দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানও অর্থায়ন করবে বলে ঘোষণা করেছে। এই তহবিল জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে কম অবদান রাখে এমন দেশগুলোর জন্য উপহারস্বরূপ বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
কয়েক সপ্তাহ আগেও কপ২৮-এ তহবিলটি কীভাবে কার্যকর করা এবং আদৌ কার্যকর করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও মতবিরোধ ছিল আলোচকদের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত যেসব দেশ তহবিল গঠনে সম্মত হয়েছে এবং অর্থায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এটাকেই কপ২৮-এর সফলতা বলে আখ্যায়িত করা যায়।
লেখক :অ্যাড্রিয়েন আরশট-রকফেলার ফাউন্ডেশন
রেজিলিয়েন্স সেন্টারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা
ন্যাটোর মতো অর্থায়নব্যবস্থা লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে
ফ্রান্সিস শিন ও থিওফাইল পগেট-অ্যাবাদি
২০০৬ রিগা শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা প্রতিরক্ষা খাতে তাদের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ ব্যয় করার অঙ্গীকার করেন। বিষয়টা ন্যাটোতে একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসে। এটা জোটের জন্য অর্থায়নে তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থপূর্ণ অবদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। জলবায়ু তহবিলে এমন ধরনের অর্থায়নব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য কার্বনের ব্যবহার কমানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারগুলোর মধ্যে একটি। এটা জলবায়ু পরিবর্তন থেকে উদ্ভূত শারীরিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে এবং বিশেষ করে রাশিয়ার ওপর তেল ও গ্যাসনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ন্যাটোতে যেমন সদস্য দেশগুলো তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থনৈতিক অবদান রাখছে, তেমনি জলবায়ু সমস্যা সমাধানে প্রতিটি দেশ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নির্দিষ্ট একটা অংশ সামগ্রিক জলবায়ুসংকট মোকাবিলা করতে আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখতে পারে। এর ফলে বৃহত্ অর্থনীতির দেশগুলো যেমন অর্থনৈতিকভাবে বেশি অবদান রাখতে পারবে, তেমনি দরিদ্র দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক চাপ কমবে। এছাড়া, প্রতিটি দেশ যদি তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থায়ন করে, তাহলে সবাই জলবায়ুসংকট নিরসনে কার্বনের ব্যবহার সীমিত রাখতে একধরনের দায়িত্ববোধ অনুভব করবে।
লেখকদ্বয় যথাক্রমে আটলান্টিক কাউন্সিলের একজন গবেষণা সহকারী ও ইউরোপ সেন্টারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ :আব্দুল্লাহ আল মামুন
