বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্বিষহ দিন কেটেছে আমার: তপু বর্মন 

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৩:১১

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে দুই দফায় ইজিবাইকে চড়ে গোদনাইল, চৌধুরীবাড়ি এলাকা। নতুন পিচঢালা সড়ক তৈরি করে পুরোন রেলপথ ঢেকে ফেলা হয়েছে। নতুন সড়কের দুপাশে নতুন নতুন বাড়ি। এই সড়কের বাঁয়ে ঢুকলেই ভেতরে জাতীয় দলের ডিফেন্ডার তপু বর্মনের নির্মাণাধীন বাসা। এর সামনেই গতকাল সকালবেলা চায়ের দোকানে টুলে বসে রং চা খাচ্ছিলেন তপু বর্মন। কাছেই ছিলেন বাবা দয়াল বর্মন। দুই পুত্রসন্তানের ছোট তপু বর্মন, নিষেধাজ্ঞায় পড়েছিলেন। 

আবার মাঠে ফেরার খবরে তপুর পরিবার যেন দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়েছে। সন্তানের সুখবরে আবেগে আপ্লুত হলেন তপুর বাবা দয়াল বর্মন। তার নাকি এখনো বিশ্বাস হয় না যে, ছেলের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আসতে পারে। বাবার স্বপ্ন পূরণ করা তপু ১৪ বছর ফুটবল খেলেছেন, কিন্তু কখনো অভিযোগ আসেনি। ‘যা কিছু হয়েছে, সব ভুলে যেন ফুটবলে মন দেয় তপু। ক্লাবের জন্য খেলতে হবে, দেশের জন্য খেলতে হবে’—রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলছিলেন তপুর বাবা।

তপুর বাসায় নতুন অতিথি, ১৫ নভেম্বর পুত্রসন্তানের জনক হয়েছেন। নাম সাগনিক বর্মন। তপুর স্ত্রী কৃষ্ণা চাকী স্বর্ণালী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এমবিবিএস শেষ করে ইন্টার্নি করছিলেন, পুত্রসন্তান নিয়ে ব্যস্ত স্বর্ণালী। সেপ্টেম্বরে তপু নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন। সন্তান জন্মদানের সময় ঘনিয়ে আসার সময়টায় দুশ্চিন্তায় কেটেছে তপুর স্ত্রীর। শিশুসন্তান কোলে স্বর্ণা বলছিলেন, ‘আমি এক ফোঁটা শান্তি পাচ্ছিলাম না। তপু নিজেকে গিল্টি ফিল করছে। তপু মানসিকভাবে খুব আপসেট ছিল। মেন্টাললি ট্রমাটাইজড ছিল। গত দুই-তিন মাস খুব কঠিন সময় গেছে আমাদের। বাবুটা হওয়ার আগের সময়টা আমার জন্য উপভোগ্য ছিল না। যাই হোক, যা কিছু ঘটেছে, চলে গেছে। জানতে পারলাম, তপু টিমে ব্যাক করছে। আগের মতো যেন আবার খেলতে পারে। এটাই চাই।’

সেপ্টেম্বরে মালদ্বীপে মাজিয়া স্পোর্টসের বিপক্ষে খেলে ঢাকায় ফিরলে ৪৭ ডলারে কেনা তিনটা মদের বোতল পাওয়া যায় তপুর ব্যাগে। তপুর স্ত্রী বলেন, ‘হয়তো তপু কাউকে গিফট দেওয়ার জন হোক কিংবা কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়েই হোক, আমার ব্যক্তিভাবে মনে হচ্ছে লগু পাপে গুরুদণ্ড হয়েছে। ক্লাব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, হয়তো সেটা তপুর ভালোর জন্য। তবে তপুর জীবনে এ ঘটনা আর যেন না হয়, সেটাই চাই।’

বসুন্ধরা কিংসের ফুটবলার তপু। ক্লাব কর্তৃপক্ষ তপুকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। টানা ৭৫ দিন তপু অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন। টানা এক মাস ঘুম ছিল না। খুব বাজে সময় গেছে। খেতেও পারেননি। ঘর থেকেও বের হতে চাইতেন না। নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে যতটুকু যা করার করেছেন। নারায়ণগঞ্জে লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের মাঠে ফুটবল খেলেছেন। ঘরে সাইক্লিং করেছেন। তপু বলেন, ‘এমন বাজে পরিস্থিতিতে আমি পড়িনি কখনো। আপনি যদি টেনশনে থাকেন, তাহলে খাবেন কীভাবে! আমি এখন আর এগুলো নিয়ে ভাবতে চাই না। আমার দুর্বিষহ দিন কেটেছে। ঘুম ছিল না। খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতাম না। সবাই জানতে চাইত কী হয়েছে।’

তপু বলেন, ‘আমি সামাজিকভাবে আঘাত পেয়েছি। আঘাত দিয়েছি। আমি লজ্জিত। আমি ১৪ বছর ধরে ফুটবল খেলি। কেউ বলতে পারবে না। আমি অ্যালকোহল খাই না। সিগারেট খাই না। লাইফে এই শাস্তিটা শিক্ষা হয়েছে। ক্লাব যে সিদ্ধান্তটা দিয়েছে, সেটা ঠিক আছে। অন্য ফুটবলাররা সচেতন হবে। ভুল করবে না।’

অস্ট্রেলিয়া, মালদ্বীপ, লেবাননের বিপক্ষে ম্যাচ টিভির পর্দায় দেখেছেন তপু। খারাপ লেগেছে, রক্ষণভাগে নিজের জায়গায় থাকলে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতেন তপু। বললেন, ‘আমি যখন নেই, তখন আমাকে নিয়ে কেউ ভাববে না। তবে যারা খেলেছে, তারা ১০০ পারসেন্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছে।’ তপু কিংসে খেলছেন পাঁচ বছর।

ইত্তেফাক/জেডএইচ