বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সিভিকাস মনিটরের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের কথা বলার স্থান বন্ধ

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৭:২২

বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের কথা বলার স্থান বন্ধ (ক্লোজড) হয়ে গেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন সিভিকাস মনিটর নতুন এক প্রতিবেদনে এমনটা দাবি করেছে। এছাড়াও প্রতিবেদনে দেশের আগামী নির্বাচনে যেন সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দৌড়ে বিরোধী রাজনীতিবিদ ও স্বাধীন সমালোচকদের ওপর সরকারের ব্যাপক দমন-পীড়নের কারণে রিপোর্টে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের মান এত নিম্নমুখী বলে দাবি করেছে সিভিকাস মনিটর।

পিপল পাওয়ার আন্ডার অ্যাটাক ২০২৩ নামের এই প্রতিবেদনে ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের নাগরিকদের অবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সিভিকাসের করা বাংলাদেশের এই রেটিং সবচেয়ে খারাপ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ মানবাধিকার রক্ষক, সাংবাদিক, বিক্ষোভকারী ও অন্যান্য সমালোচকদের ভয়ভীতি, সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু করেছে। অপরদিকে নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার বিরোধী দলের সদস্যকে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করছে।

সিভিকসের এশিয়া-প্যাসিফিক গবেষক জোসেফ বেনেডিক্ট বলেছেন, ‘আমাদের তথ্য প্রমাণ করে, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কিছুতেই আটাকায়নি। চলমান পরিবেশে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না।’

সিভিকাস মনিটর প্রতিটি দেশের নাগরিক সমাজের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বছরজুড়ে দেশভিত্তিক নাগরিক সমাজের অধিকারকর্মী, অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা দল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সূচক ও মনিটরের নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সংগৃহীত ডাটা নিয়ে।

এই চারটি আলাদা উৎস থেকে প্রাপ্ত ডাটাকে তারপর সংকলিত করে প্রতিটি দেশকে ৪টি ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। তা হলো— ওপেন (বা মুক্ত), ন্যারোড (বা সংকীর্ণ), অবস্ট্রাকটেড (বা বাধার সম্মুখীন) রিপ্রেসড অর ক্লোজড (বা নিষ্পেষণমূলক, বন্ধ হয়ে যাওয়া)। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বোঝানো হয় ক্লোজড ক্যাটেগরি দিয়ে। এই ক্যাটেগরিতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বেও ২৮টি বিধিনিষেধের দেশের মধ্যে অন্যতম।

চলতি বছর মানবজাতির প্রায় এক তৃতীয়াংশ বা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩০ দশমিক ৬ ভাগই বসবাস করছেন ‘ক্লোজড’ ক্যাটাগরির দেশে। ২০১৮ সাল থেকে সিভিকাস মনিটর এই রেকর্ড রাখা শুরু করে। তারপর থেকে এমন ক্যাটেগরিতে থাকা মানুষের সর্বোচ্চ সংখ্যক এ বছর রেকর্ড করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র ২ দশমিক ১ ভাগ মানুষ মুক্ত বা ওপেন ক্যাটাগরির দেশে বাস করেন। সেখানে নাগরিকদের জন্য কথা বলার স্থান উন্মুক্ত ও সুরক্ষিত। তবে শতকরা এই হার এ বছরেই সবচেয়ে কম। এসব পরিসংখ্যান একসঙ্গে মিলে বিশ্বের সঙ্কটজনক অবস্থাকেই নির্দেশ করে।

সিভিকাস মনিটরের শীর্ষ গবেষক মারিয়ানা বেলালবা ব্যারেতো বলেন, নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে অস্বাভাবিক দমনপীড়ন প্রত্যক্ষ করছি আমরা। বিশ্বে অধিকার লঙ্ঘনের সামনের সারিতে আছে এখন বাংলাদেশ। নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের কার্যত এখন কর্মকাণ্ড চালানোর মতো স্পেস নেই। রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘ক্র্যাশ’ করে দেওয়ার সহিংস উদ্দেশ্যই বাংলাদেশের রেটিং অবনমনের প্রধান কারণ।

প্রতিবাদ সমাবেশ ও সড়কে অবরোধ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। তারপরও কেউ যদি বেরিয়ে আসেন প্রতিবাদ করতে বৈষম্যমূলকভাবে তাদের ওপর রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ছোড়া হয়। বিরোধী দলীয় সমর্থকদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের হাতে থাকে হাতুড়ি, লাঠিসহ অন্যান্য জিনিস। তারা এসব নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করে। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন তা দাঁড়িয়ে দেখে। যেসব সাংবাদিক রাষ্ট্রীয় অনিয়ম উন্মোচন করে দেন কর্তৃপক্ষ তাদেরকে টার্গেট করে ও সমালোচনাকারী মিডিয়া আউটলেটকে বন্ধ করে দেয়।

অনলাইনে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিবর্তে নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাবেক বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিষ্পেষণমূলক কিছু অংশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এটা অনলাইনের সমালোচনাকারী হাজারো মানুষকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যবহার করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মানবাধিকারের পক্ষের কর্মীদেরও হয়রান বৃদ্ধি পেয়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের দ্বারা। এর মধ্যে আছেন নির্বাসনে থাকা ব্যক্তি ও তাদের পরিবারও। সেপ্টেম্বরে সুপরিচিত অধিকার বিষয়ক কর্মী আদিলুর রহমান খান ও নাসিরউদ্দিন এলানকে দুই বছরের জেল দেয় ঢাকার একটি আদালত। ১০ বছর আগে বিচারবহির্ভূত একটি হত্যাকাণ্ডের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে তাদেরকে এই শাস্তি দেওয়া হয়। তারপর থেকে তারা জেলেই ছিলেন। অবশ্য পরে তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

এই রিপোর্টে অন্য যেসব দেশের রেটিং অবনমন হয়েছে তার মধ্যে আছে বসনিয়া হার্জেগোভিনা, জার্মানি, কিরগিজস্তান, সেনেগাল, শ্রীলঙ্কা ও ভেনিজুয়েলা।

ইত্তেফাক/এসএটি