হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) পারস্যের ‘সঞ্জর’ নামক কসবায় ৫৩০ হিজরি সালে রসুলুল্লাহ (স.)-এর পবিত্র বংশধারায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কঠোরতম ইবাদত-বন্দেগি ও অতুলনীয় আত্মিক সাধনাবলে আধ্যাত্মিকতার উচ্চতম অবস্থান অর্জন করেন। তার পবিত্র নামের সঙ্গে যেসব উপাধি যুক্ত করা হয়ে থাকে, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে (১) আতায়ে রসুল, (২) সুলতানুল হিন্দ, (৩) গরিবে নাওয়াজ। প্রথমত তিনি (আধ্যাত্মিকভাবে) রসুল পাক (স.)-এর কাছ থেকে ভারতে ইসলাম প্রচার করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা লাভ করেন, তাই তিনি ‘আতায়ে রসুল’, অর্থাত্ রসুল (স.)-এর দান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অলৌকিক নির্দেশ ও অলৌকিক ক্ষমতাপ্রাপ্তির বিষয়টি পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত (সুরা আল ইমরান: আয়াত-৪৯)। দ্বিতীয়ত ইতিহাস সাক্ষী যে, তিনি ভারতে ইসলাম প্রচারে এসে অগণিত মানুষকে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রভিত্তিক বৈষম্যের অন্ধকার থেকে মুক্ত করেছেন এবং সব বিশ্বাসের মানুষ তাকে আধ্যাত্মিক সম্রাটের মর্যাদায় গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, তাই তিনি ‘সুলতানুল হিন্দ’, অর্থাত্ ভারতের আধ্যাত্মিক সম্রাট। তৃতীয়ত তিনি ‘গরিবে নাওয়াজ’, অর্থাত্ তিনি গরিবের সাহায্যকারী। এই বিশেষ গুণ তার জীবনদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং গরিবের প্রতি ভালোবাসাকে তিনি ধর্মীয় উপাসনার মর্যাদা দান করেছেন।
প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী তিনি ৫৮৭ হিজরি সাল তথা ১১৯১ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতে প্রবেশ করেন। ভারত তখন পৃথিবীর বৃহত্তম পৌত্তলিক দেশ এবং বহিরাগত কোনো মুসলমান ধর্মপ্রচারকের জন্য তা উত্তপ্ত লাভার মতো ছিল। বহিরাগত মুসলমান রাজশক্তিরা বারবার আক্রমণ, হিন্দুদের ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস, ধনদৌলত লুণ্ঠন (কোনো কোনো ক্ষেত্রে) করার কারণে ভারতে তখন মুসলিমবিদ্বেষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। এই উত্তপ্ত লাভার মধ্যে হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় মাত্র ৪০ জন দরবেশ সঙ্গে নিয়ে ৫৮৭ হিজরি সনে ভারতে প্রবেশ করেন এবং মুলতান, লাহোর, সামানা হয়ে রাজধানী দিল্লিতে উপস্থিত হন।
বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী রাজা পৃথ্বিরাজ চৌহানের প্রশাসনিক রাজধানী ছিল দিল্লি এবং তার সামরিক রাজধানী ছিল আজমির। হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) দিল্লিতে উপস্থিত হওয়ার সময়কালেই দিল্লি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরবর্তী তারায়েনা নামক স্থানে গজনির সুলতান শাহাবুদ্দীন গোরী মহাপরাক্রমশালী রাজা পৃথ্বিরাজ চৌহান কর্তৃক আক্রান্ত হন এবং শোচনীয় পরাজয় বরণ করে কোনো রকমে জীবন রক্ষা করে পালিয়ে যান। এই চরম বিপত্সংকুল পথেই হজরত খাজা গরিবে নাওয়াজ মহান আল্লাহর করুণার ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে দিল্লিতে পৌঁছে যান।
পৃথ্বিরাজ চৌহান তার প্রশাসনিক রাজধানী দিল্লিতে তার ভাই খান্ডে রাওকে দায়িত্বে বসিয়ে নিজে সামরিক রাজধানী আজমিরে অবস্থান করেন। হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) দিল্লিতে পৌঁছালে চরম মুসলিমবিদ্বেষী খান্ডে রাও এবং তার সহচরগণ তাকে দিল্লি থেকে উত্খাতের বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু তার ভুবন মোহন জ্যোতি ও আত্মিক শক্তির সামনে এসে সবাই বিমোহিত ও বিচলিত হতে থাকে এবং জনগণের এক বিরাট অংশ ক্রমান্বয়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়ে পড়ে।
Love for all, Malice for none (সবার জন্য ভালোবাসা, বিদ্বেষ নয় কারোর জন্য)—এই মহামানবিক আদর্শ অনুসরণ করে তিনি অগণিত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রিত করেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে কয়েক হাজার বিধর্মী ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যান। তিনি তার প্রিয় খলিফা হজরত কোতবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি (রহ.)কে দিল্লিতে তার স্থলাভিষিক্ত করে আজমির অভিমুখে যাত্রা করেন। ৫৮৭ হিজরি সালেই তিনি দিল্লি থেকে আজমিরে যাত্রা করেন। ‘The Future of Islam’ গ্রন্থের লেখক রেফারেন্সসহ বর্ণনা করেছেন যে, হজরত দিল্লি থেকে আজমিরে আসার পথে প্রায় ৭০০ পরিবারের কয়েক হাজার সদস্যকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছেন।
হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) আজমিরে পদার্পণ করার পর সরাসরি পৃথ্বিরাজের রাজকীয় মহলের কাছে একটি গাছের নিচে অবস্থান গ্রহণ করেন। সেখানে তার আল্লাহ প্রদত্ত অলৌকি শক্তি প্রকাশিত হয়। যারা তাকে উত্খাত করতে এসেছিল, তারা তার আধ্যাত্মিক শক্তির কাছে পরাজিত হয় এবং তিনি আজমিরের এলাকাভুক্ত কৃত্রিম হ্রদ আনাসাগরের তীরে একটি পাহাড়ের গুহায় অবস্থান গ্রহণ করেন। এখানেই তিনি দীর্ঘদিন সাধনামগ্ন জীবনাচার ও ইসলাম প্রচারের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তিনি ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের নীতি সম্পূর্ণ পরিহার করেন, বিধর্মীদের উপাসনালয় ভাঙাকে তিনি অপরাধ বলে গ্রহণ করেন। তার অপরিমেয় আত্মিক শক্তি, সবার জন্য ভালোবাসা, গরিবের প্রতি সীমাহীন সমবেদনা প্রভৃতি গুণ দ্বারা সব শ্রেণি ও বিশ্বাসের মানুষের অন্তর রাজ্যকে গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করেন। অবিশ্বাসীর অন্তরে তিনি ইমানের কাবা তৈরি করে দিয়েছেন, যা থেকে তিনি আর কখনো মুখ ফেরাননি। ক্রমান্বয়ে রাজগুরু মোহন্ত রামদেব, তত্কালীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ যোগসাধক অজয় পাল (জয় পাল) প্রমুখ হিন্দুধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণ হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে ইসলামে দীক্ষিত হন। সেই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রিত হতে থাকে। গবেষকদের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.) এককভাবে প্রায় ৯০ লাখ বিধর্মীকে ইসলামে দীক্ষিত করেছেন। ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত তার খলিফা বা প্রতিনিধিগণের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ নেই।
১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তারায়েনার দ্বিতীয় যুদ্ধে মোহাম্মদ গোরী পৃথ্বিরাজকে পরাজিত ও নিহত করেন। তিনি আজমিরে এসে হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন এবং তার উপদেশ অনুযায়ী পৃথ্বিরাজের পরিবারের প্রতি সদয় ব্যবহার, পৃথ্বিরাজের ছেলেকে রাজকার্যে নিয়োগ প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মোহাম্মদ গোরী এত যুদ্ধ-বিগ্রহের বিনিময়ে প্রাপ্ত দিল্লির সিংহাসনে বসে বংশীয় রাজত্ব প্রতিষ্ঠা না করে ক্রীতদাস সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেককে দিল্লির সিংহাসনে বসিয়ে চলে যান। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে মোহাম্মদ গোরীর এই অসাধারণ মানবিক কার্যাবলি হজরত খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর উপদেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল।
কোটি কোটি মানুষকে ইসলাম ধর্মে অন্তর্ভুক্ত করে, সব ধর্মবিশ্বাসের মানুষের অন্তর জয় করে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অপরিমেয় সমবেদনা ও সহায়তা প্রকাশ করে, নিজের মাতৃভূমিকে চিরতরে পরিত্যাগ করে এই বৃহত্তর ভারত উপমহাদেশেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এখানেই তিনি সমাহিত হন এবং এখানেই তার জ্যোতির্ময় সমাধিকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত সব ধর্মের লাখ লাখ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
লেখক: সম্পাদক, ত্রৈমাসিক প্রদীপন

