তালা উপজেলার বারাত গ্রামের পুষ্প রানী দাসকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ঘাতকরা। এরপর তার হাত ও পায়ের সব আঙুল কেটে দেয়। শেষে গায়ে কেমিকেল ঢেলে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে পুষ্প রানীর মৃত্যুর ঘটনায় তার ছেলে জয়দেব দাস বাদী হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে শুক্রবার রাতে তালা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে তালা থানার পুলিশ ছাড়াও র্যাব ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অনুসন্ধান শুরু করেছে।
সরেজমিনে রবিবার দুপুরে তালা উপজেলার বারাত গ্রামে গেলে চিত্তরঞ্জন দাস, মহাদেব দাস, পরিমল দাস, ভোলানাথ দাস, অরুন দাস, লক্ষীরানী দাসসহ কয়েকজন জানান, ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর মনোরঞ্জন দাস মারা যান। এরপর থেকে একই গ্রামের আমজাদ হোসেন ও তার ছেলে সিরাজুলের পানের বরজে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন পুষ্প দাস। প্রতিদিনের ন্যয় ২০ জুন দুপুরে কাজ শেষে বাড়ি ফেরে পুষ্প। বিকেল প্রায় সাড়ে ৫টার দিকে একই গ্রামের মহব্বত গাজীর মেয়ে দর্জি পারভিন খাতুনের কাছে ব্লাউজ আনতে যান তিনি। তার কোন শত্রুও ছিল না।
পারভিন খাতুন বলেন, তার বাড়িতে অবস্থান করাকালে পুষ্প দাসের মোবাইলে একটি কল আসে। কল পেয়েই তিনি জানান, মোহনা বাজারে যাচ্ছেন। রাত সাড়ে সাতটার সময় থেকে পুষ্প রানীর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বারাত গ্রামের বেলাল শেখ জানান, গত শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি নিজের পাট ক্ষেত দেখতে যান। সেখানে গিয়ে দুর্গন্ধ নাকে আসায় ভিতরে যেয়ে এক নারীকে মৃত পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি দ্রুত বাড়ি এসে বড় ভাই রবিউলকে ডেকে নিয়ে যান।
রবিউল, তার ভাই বেলাল, তাদের বাবা ওহাব শেখ, প্রতিবেশি মফিজুল শেখসহ কয়েকজন জানান, অনেক সময় কুকুরে যেমন পাট ভাঙে তেমনি পাট ভাঙা ছিল। একটি চেকের লুঙ্গির উপর এক পা ভাজ করা ও এক পা লম্বা অবস্থায় বস্ত্রহীন পড়ে ছিলেন ওই মহিলা। একটি লুঙ্গির ওপর তাকে রাখা হয়েছিল। দু’হাত ও দু’পায়ের সকল আঙুল কাটা ছিল। গলায় দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়েছে এমন চিহ্ন দেখা যায়। লাশ পঁচে গলে গেলেও মুখমণ্ডলের এক পাশ ভাল থাকায় ও চুল দেখে পুষ্প রানীকে সনাক্ত করা যায়।
তবে তাকে অন্যত্র ধর্ষণের পর হাত ও পায়ের আঙুল কেটে গলায় দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যাকারীরা। যাতে তাকে কেউ চিনতে না পারে সেজন্য শরীরে কেমিকেল দিয়ে এ পাটক্ষেতে রেখে যাওয়া হয় বলে তারা ধারণা করছেন।
তবে মোহনা বাজার ও যেখানে লাশ পাওয়া গেছে তার আশে পাশে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বারাত গ্রামের কার্তিক দাসের ছেলে গোপাল দাস মোবাইল ফোনে পুষ্পকে ডেকে এনেছিল। তবে গোপাল দাসের বাড়িতে গেলে সে মোবাইল ফোন মেরামত করতে গেছে বলে তার ছেলে শুভঙ্কর দাস জানায়। শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত গোপাল দাসের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গেলে তালা থানার ওসি মেহেদী রাসেল জানান, শুক্রবার রাতে মৃতের বড় ছেলে জয়দেব বাদী হয়ে কারও নাম উল্লেখ না করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। প্রাথমিকভাবে এটাকে হত্যা বলে মনে করা হলেও ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ধর্ষণ বা কিভাবে মৃত্যু হয়েছে তা বলা যাবে না। তবে নিহতের মোবাইল কললিস্টের পাশাপাশি অনুসন্ধানকালে যেসব লোকের নাম সন্দেহজনক হিসেবে উঠে এসেছে তাদের মোবাইল কললিস্ট ও যাচাই করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এর রহস্য উন্মোচন হবে বলে তিনি আশাবাদী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক র্যাব কর্মকর্তা জানালেন তারাও ঘটনার তথ্য অনুসন্ধানে নেমেছেন। রহস্য উন্মোচন হতে সময় লাগবে না।
প্রসঙ্গত, গত ২০ জুন বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি থেকে দর্জির বাড়িতে ব্লাউজ আনতে গিয়ে তালা উপজেলার বারাত গ্রামের মনোরঞ্জন দাসের স্ত্রী পুষ্প রানী নাথ আর বাড়ি ফেরেননি। এ ঘটনায় তার বড় ছেলে মহাদেব ২২ জুন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
আরও পড়ুন: গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিএনপির বিক্ষোভ
২৮ জুন দুপুর দুইটার দিকে পুলিশ বারাত গ্রামের এড. কেসমত আলীর ইজারা দেওয়া ওহাব শেখের পাটক্ষেত থেকে পুলিশ পুষ্প রানীর গলিত লাশ উদ্ধার করে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্ত শেষে শনিবার রাত ৮টার দিকে ভাগবা শ্মশানে মৃতের লাশ দাফন করা হয়।
ইত্তেফাক/নূহু
