বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

জীবনযোদ্ধা মা

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:৩৫

দুমুঠো ভাতের আশায় ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে চায়ের দোকানের পাশাপাশি অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন নাসিমা আক্তার নামে এক নারী। স্বামী বা কোনো আপনজন না থাকায় জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে দীর্ঘদিন ধরেই এই কষ্টসাধ্য কাজ করে আসছেন তিনি। জানা যায়, ১০ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়। তখন তার দুই মেয়ে এবং পেটে এক সন্তান ছিল। এরপর জীবন চালিয়ে নিতে বেছে নেন চায়ের দোকান। কিন্তু ছোট্ট এই দোকান চালিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হওয়ায় বর্তমানে এর পাশাপাশি বেছে নিয়েছেন অটোরিকশা চালানো। সিদ্ধিরগঞ্জের ব্যস্ততম পয়েন্ট শিমরাইল মোড় এলাকায় ডেমরা সড়কে অটোরিকশা চাালিয়ে এবং রাতে দোকানে চা বিক্রি করেন ঐ নারী। বসবাস করেন ডেমরার শুকুরসী এলাকায়। বিধবা নাছিমার সংসারে তিন মেয়ে। এভাবে কাজ করেই বড় মেয়ের (২০) বিয়ে দিয়েছেন। মেজো মেয়ে  (১৫) ও ছোট মেয়েকে (১০) একটি মাদ্রাসায় রেখে পড়াচ্ছেন। নাসিমার জন্ম সিলেটের কামারপাড়ায়। সেখান থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে আসেন। বিবাহ হয় এক ট্রাক চালকের সঙ্গে। সুখের সংসারই ছিল তার। হঠাৎ স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। বর্তমানে তার পিতা-মাতাও বেঁচে নেই। তিন মেয়েকে নিয়ে বাঁচার তাগিদে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ডেমরা সড়কের গলাকাটা পুলের পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান দেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাসিমা আক্তার বলেন, আগে ঘরভাড়া দিয়ে থাকতেন। কিন্তু দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে এখন ঘরভাড়া দিতে পারেন না। তাই রাস্তার পাশে কোনো রকম এক বাসা তৈরি করে বসবাস করেন। সন্ধ্যা ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখেন। বেলা ১০টা থেকে বিকাল পর্যন্ত অটোরিকশা চালান। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, নারী বলে অনেকেই তার অটোরিকশা উঠতে চান না। তাছাড়া অটোরিকশা চালান অনেকেই তা ভালোভাবে নেয় না। তার আকুতি, ‘যদি সরকার অন্তত একটা থাকার ঘর তৈরি করে দিত তাহলে আমি একটু ভালো করে চলতে পারতাম। বয়স হয়ে যাওয়ায় অটোরিকশা চালাতে গিয়ে শরীরে ব্যথা অনুভব হয়। তারপরও কষ্ট করে গাড়ি চালাতে বাধ্য হই। আবার টানা দোকানদারিও করতে পারি না। পা ফুলে যায়। আমার পাশে তো দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আমরা মা-বাবা, ভাইবোন কেউই নেই। আমি অনেক কষ্টে আছি। এভাবে আর কতদিন কষ্ট করে যাব তা আল্লাহই ভালো জানেন। বড় মেয়ের মতো বাকি দুই মেয়েকেও মানুষের মতো মানুষ বানিয়ে বিয়ে দিতে পারলেই জীবনে আর কোনো চাওয়া পাওয়ার কিছু থাকবে না।’ 

নারায়ণগঞ্জ সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান সরদার জানান, ‘আমরা এই ধরনের নারীকে সাধুবাদ জানাই। উনি প্রতিকূলতা জয় করে কারো কাছে হাত না পেতে যেভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন, পাশাপাশি দুই মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছেন তাতে তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এছাড়া কোনো কাজেই নারী-পুরুষের ভেদাভেদ নেই—তা তিনি প্রমাণ করলেন। আশা করছি, তাকে দেখে অনেক নারী এভাবে প্রতিকূলতা জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করব।’

ইত্তেফাক/এসটিএম