কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সমবায়ের ভূমিকা

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:১৫

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের সরাসরি ও চূড়ান্তভাবে ভোক্তাদের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করার আর্থিক ও লজিস্টিক ক্ষমতা নেই। তারা চাষাবাদের সময় মূলধনের জন্য গ্রামীণ মহাজনদের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া তারা তাদের উত্পাদিত পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য থাকে। বিদ্যমান কৃষি বিপণনব্যবস্থায় খামার থেকে ভোক্তাদের কাছে কৃষিপণ্য সরবরাহ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় অসংখ্য আন্তঃসংযুক্ত ক্রিয়াকলাপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; যেমন: উত্পাদনের পরিকল্পনা করা, উত্পাদন ও ফসল তোলা, গ্রেডিং, প্যাকিং, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও বিক্রয়। কৃষকরা উত্পাদন ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত, যেখানে মধ্যস্থতাকারীরা একত্রীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ ও বিপণনে জড়িত। বিপণন-কার্যক্রমের এজেন্টরা হলেন—‘ফড়িয়া’ বা সংগ্রাহক, ‘বেপারি’ বা অ্যাসেম্বলার, ‘আড়তদার’ বা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা।

চালের বিপণনব্যবস্থা একটু ভিন্ন। এখানে কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে বাজার চেইনে একদল মধ্যস্থতাকারী রয়েছে। বেপারি ও আড়তদার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করে। তারা ধান থেকে চাল তৈরির জন্য এটা রাইস মিলে পাঠায়। রাইস মিলার কাজ শেষে আড়তদারের কাছে পাঠায়। এরপর আড়তদার পাইকারি বিক্রেতার কাছে সেগুলো বিক্রি করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাইস মিলার সরাসরি পাইকারি বিক্রেতার কাছে চাল পাঠিয়ে দেয়। খুচরা বিক্রেতা পাইকারি বিক্রেতার কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করে। ভোক্তাদের কাছে খুচরা বিক্রেতাদের পণ্য  বিক্রির মাধ্যমে এই সাপ্লাই চেইন শেষ হয়। শাকসবজি ও ফলের বাজারের সাপ্লাই চেইন প্রায় চালের মতোই, তবে কাঁচা মালের  ক্ষেত্রে কোনো মিলার থাকে না। এসব সাপ্লাই চেইন বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে থাকে; যেমন: ঠেলাগাড়ি, রিকশা, ভ্যান, টেম্পু, পিক-আপ, নৌকা, বাস ইত্যাদি। এর মধ্যে বেশিরভাগ সময় বেপারী ও আড়তদারদের নিজস্ব পিক-আপ থাকে। খুচরা বিক্রেতারা অধিকাংশ সময় তাদের পণ্য পরিবহনের প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে ভ্যান ব্যবহার করে থাকে।

২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (বিজেপিএ) থেকে প্রকাশিত মো. মিজানুর রহমান ও শাহনাজ বেগম নীনা দ্বারা পরিচালিত একটা অভিজ্ঞতামূলক গবেষণা ‘বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা: সিলেট জেলার কেস স্টাডি’ থেকে জানা যায়, ১০০ কেজি চাল বাজারজাতকরণে সর্বোচ্চ মূল্য থাকে যথাক্রমে খুচরা বিক্রেতার কাছে ২৯৮.৭৬ টাকা, বেপারীর কাছে ২০০.৭৫ টাকা, পাইকারি বিক্রেতার কাছে ১২১.৮৭ টাকা ও আড়তদারের কাছে ৭১.৪২ টাকা। বেপারী বা পাইকারি বিক্রেতা আড়তদারদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৬২.৩৫ শতাংশ কমিশন পায়। আড়তদারের সবচেয়ে বেশি খরচ হয় পণ্য লোডিং ও আনলোডিংয়ের সময়। এছাড়াও তাদের অন্যান্য খাতে খরচের ভার বইতে হয়; যেমন প্রতি ১০০ টাকায় বাজারের টোল ১৯.৬৭ টাকা, অপচয় টাকা, মজুরি ও বেতন ১৫.২১ টাকা, ভাড়া ও বিদ্যুৎ ৮.৬৪ টাকা, স্টোরেজ ৫.৮২ টাকা ও ব্যক্তিগত খরচ ৫.৬১ টাকা।

খুচরা বিক্রেতারা মজুরি ও বেতনের জন্য সবচেয়ে বেশি খরচ করে; যেটা প্রায় ২৬.০৫ শতাংশ। অন্যান্য খরচের মধ্যে রয়েছে ভাড়া ও বিদ্যুত্ ১৭.৮৮ শতাংশ, স্টোরেজ ১১.৭৭ শতাংশ, পরিবহন ১১.২৪ শতাংশ, অপচয় ৮.১১ শতাংশ, বাজারের টোল ৭.০২ শতাংশ, লোডিং ও আনলোডিং ৫.৫৬ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত খরচ ২.০১ শতাংশ। পাইকারি বিক্রেতা মোট বিপণন খরচের প্রায় ৪৬ শতাংশ পরিবহন এবং লোডিং ও আনলোডিংয়ে ব্যয় করে। কোনো মধ্যস্থতাকারী শ্রেণি গ্রেডিংয়ের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত খরচ এক গ্রুপ থেকে অন্য গ্রুপের হিসাবে কমবেশি হয়ে থাকে। সব শ্রেণির ব্যবসায়ীদের জন্য অপচয় ছিল আরেকটি অপরিহার্য অংশ। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা খাতে কম খরচ করা বেশ লাভজনক ছিল।  আউশ, আমন ও বোরো ধানের ব্যবসায়ীদের বিপণনখরচ ভিন্ন ছিল।

বাংলাদেশে কৃষিবিপণনের আইন থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়ক ব্যবস্থা নেই। ফলে বিপণনের ভূমিকা পালন করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা এবং এ কারণে কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে সমবায় বিপণনব্যবস্থা আমাদের কৃষকদের জন্য কৃষিপণ্য বিপণনের অন্যতম মডেল হতে পারে।

কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের অন্যতম অসুবিধা হলো দামের ওঠা-নামা। ফসল তোলার পরপরই ফসলের বাজারদর পড়ে যায় এবং পরবর্তী সময় বেড়ে যায়। এর কারণ হলো, ফসল তোলার পর কৃষকরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তাদের ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করে। স্টোরেজ সুবিধার অভাবও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বছরের এই সময়ে, চাহিদার চেয়ে উত্পাদন বেশি হয়, যার জন্য পণ্যের দাম কমে যায়। ফসল তোলার সময় দাম কম থাকায় কৃষকরা তাদের উত্পাদিত পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে ন্যায্য আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার প্রায়শই কৃষকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মূল্যে ফসল, বিশেষ করে ধান ক্রয় করে থাকে। সরকারের নির্ধারিত দাম বাজারদরের চেয়ে বেশি হওয়ায়, এতে লাভবান হওয়ার কথা কৃষকদের। কিন্তু এটা প্রায়শই সম্ভব হয় না, কারণ সেলিং আউটলেটগুলোতে সরাসরি ফসল বিক্রয় করা বেশ ব্যয়বহুল ও সমস্যাপূর্ণ।

সমবায়ব্যবস্থা বিপণনব্যবস্থার উন্নতির জন্যও কাজ করতে পারে। এটা এক বা একাধিক অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যের সমন্বয় সাধনের জন্য গঠন করা যেতে পারে; যেমন—(১) কম খরচে পরিষেবা সরবরাহ করা, (২) স্থানীয় বাজারে একচেটিয়া ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করার জন্য একটা বিকল্প বাজারব্যবস্থা তৈরি করা, (৩) নতুন বা উন্নত বিপণন-পরিষেবা প্রদান, (৪) প্রযুক্তিগত তথ্য সরবরাহ, এবং উৎপাদন ও বিপণনের মধ্যে সমন্বয় সাধন।

ডেনমার্ক, সুইডেন ও জার্মানির অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে দেখা যায় যে, এই দেশগুলো তাদের উন্নয়ন কৌশলে সহযোগিতামূলক দর্শনকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সর্বোচ্চ স্তরে  পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে, কৃষিবিপণনে সমবায় সমিতি সিনার্জি প্রভাবকে ব্যবহার করতে পারে। সিনার্জি শব্দটি এমন ব্যবস্থাপনাকে বোঝায়, যেখানে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে যৌথ প্রচেষ্টার ফলাফল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার চেয়ে অনেক বেশি।

জাপানে সমবায়ব্যবস্থাগুলো বাজারজাতকৃত চালের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পরিচালনা করে। এই সমবায়গুলো শুধু রিসিভার ও স্টোরেজ এজেন্ট হিসেবে সরকারি খাদ্যসংস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং বিনিময়ে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন নিয়ে থাকে। এই সমবায়গুলো সহজ শর্তে কৃষকদের ঋণ প্রদানের পাশাপাশি সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয় করে থাকে। কিছু কিছু দেশে কৃষকদের এমন সমন্বিত বিপণনব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছে। কিছু স্বল্পোন্নত দেশে সমবায় বিপণন সমিতি গঠনের মাধ্যমে সমবায় আন্দোলনের সূচনা হয়। তানজানিয়ায় কফি বিপণন, নাইজেরিয়ায় কোকো বিপণন, উগান্ডায় তুলা বিপণন এবং মালয়েশিয়ায় চাল বিপণন অনুরূপ ঘটনার উত্কৃষ্ট উদাহরণ।

বাংলাদেশে বিপণন-পদ্ধতি খুবই ত্রুটিপূর্ণ। কারণ এখানে পণ্য সরবরাহ প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এমন পরিস্থিতি সুষ্ঠু বিপণন-প্রক্রিয়ায় গুরুতর বাধা সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ফসলের বিপণনব্যবস্থা উন্নত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, এখনো এই সেক্টরের উন্নয়ন সাধনের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এখানে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের ভূমিকা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সরকারের কোনো সহায়তা ছাড়াই বিশাল সাপ্লাই চেইন বেসরকারি খাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।

এই মুহূর্তে সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠন এবং বাজারব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক  ও প্রাতিষ্ঠানিক সেটআপের আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয় সমবায় সমিতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কৃষিপণ্য বিপণনব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে পারে।

লেখক: বাংলাদেশ কম্পিটিশন কমিশনের বেসরকারি উপদেষ্টা
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন