রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ইত্তেফাকে ছদ্মনামে কলাম-ঐতিহ্য

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

ইত্তেফাক পত্রিকাটি প্রথম দেখি ১৯৬৫ সালে, আমাদের আবদুল গনি রোডের রেল কলোনির বাসায়, যখন আমার বয়স পাঁচ-ছয়। সঙ্গে আরো দেখেছি দ্য পাকিস্তান অবজারভার, এ যুগল-পত্রিকা সূর্য ওঠার আগেই আমাদের আবাসে চলে আসত, আমার পিতা এসব পড়তেন। পরে পিতার অবসরসূত্রে আমরা গ্রামে চলে গেলেও তাঁকে দীর্ঘদিন ইত্তেফাকই পড়তে দেখেছি, যদিও স্বাধীন বাংলাদেশেই আজাদ, দৈনিক বাংলা, সংবাদ এসব পত্রিকার সঙ্গে আমার পরিচয়।

শৈশব-কৈশোরের সেই দিনগুলোতে ইত্তেফাক শুধু দেখাই হতো, পড়া হতো না। মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নের সময় থেকে পত্রিকা পাঠ শুরু। ধীরে ধীরে ইত্তেফাকের কিংবদন্তিতুল্য কলামগুলোর সঙ্গেও পরিচিত হয়ে উঠি। কলামিস্টরা এসব লিখতেন ছদ্মনামে। কারণ অপ্রিয় সত্য, নিষ্ঠুর বাস্তব সব সময় স্বনামে লেখা যেত না। তার আরো কারণ ছিল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৩ সালে জারি করেছিলেন মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যাদেশ (Press and Publication Ordinance, ১৯৬৩)। মূলত সাংবাদিকের কণ্ঠকে রুদ্ধ করার জন্যই এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট নাকি প্রায়ই প্রকৃত নাম প্রকাশের জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা জাতির বিবেক হিসেবে, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে যা বলতে চান, তা বলতেনই। স্বনামে লিখতে না পারার ব্যর্থতার চেয়ে ছদ্মনামে লিখে জাতির বিবেককে নাড়া দেয়া অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে একটি টেকসই অগ্র-পত্রিকা হিসেবে ইত্তেফাকের যে কলাম-ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল তা আজও অবিস্মৃত। ইত্তেফাকের অগ্রপুরুষ তফাজ্জল হোসের মানিক মিয়াই ছদ্মনামে কলাম লিখতে শুরু করেছিলেন। তিনি ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামের কলামে লিখতেন ‘মোসাফির’-এর কলম দিয়ে। অতঃপর আহমেদুর রহমানের ‘মিঠেকড়া’ কলামের মাধ্যমে তা বিস্তৃত হতে থাকে। তাঁর ছদ্মনামটি ছিল ‘ভীমরুল’। একে একে আরো কলাম ইত্তেফাকের জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে নিয়ে যায়। এ দুটো ছাড়াও যেসব কলাম ছিল সেসব হচ্ছে—দশ দিগন্ত (পদাতিক), ঘরে বাইরে (সন্ধানী), চতুরঙ্গ (সুহূদ), নিবেদন ইতি (অভাজন), স্থান-কাল-পাত্র (লুব্ধক), মঞ্চে নেপথ্যে (স্পষ্টভাষী), প্রিয় অপ্রিয় (সত্যদর্শী), পথে প্রান্তরে (পথচারী), দিক দিগন্ত্ত (পর্যবেক্ষক), সমদর্শন (মৃন্ময়), কালের যাত্রাধ্বনি (পান্থজন) ইত্যাদি।

রাজনৈতিক মঞ্চ, মোসাফির
মানিক মিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্ব ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্রমান্বয়ে ইত্তেফাকের যথাযথ ভূমিকার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬ দফা একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে মানিক মিয়া এক বছর কারাবরণও করেছিলেন। তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামের ‘মোসাফির’ কলমটি ছিল জাতির এক দিশারী, যার মাধ্যমে তিনি জাতিকে এক অনন্য রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। দেশ ও মানুষের প্রতি তাঁর  দরদ-ভালোবাসাই মানুষের হূদয়ে তাঁকে অবিনশ্বর করে রেখেছে।

“মানিক ভাই ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সাদাসিধে। বিলাস ও বাহুল্যকে তিনি কোনোদিন কাছে ঘেঁষতে দেননি। সামান্য আসবাবে সজ্জিত ছিল ইত্তেফাক অফিসে তাঁর ব্যক্তিগত বসবার ঘরখানি (শেখ মুজিবুর রহমান)।” শেখ মুজিবুর রহমানের ‘আমার দেখা নয়াচীন’ শীর্ষক ভ্রমণকাহিনিতে তাঁর ‘মানিক ভাই’-এর সঙ্গে সুখস্মৃতির হাজারো বয়ান রয়েছে। সম্প্রতি মানিক মিয়ার সাংবাদিক সত্তা নিয়ে একটি যথার্থ মূল্যায়ন পাওয়া গিয়েছে, “তিনি বিবেকী সাহস-উৎসারিত সাংবাদিকতার পথিকৃত্। তাঁর ‘মোসাফির’ কলম নামের ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয় এ দেশের কলাম-সাহিত্যকে পথ দেখিয়েছে। তাঁর কলামে পাকিস্তানের নয় শুধু, সারা বিশ্বের সমাজ-রাজনীতির কথা থাকত...তাঁর কলামে/ লেখায় লেজুড়বৃত্তি বা স্তাবকতার লেশমাত্র ছিল না; ছিল বিবেক উত্সারিত সাহসী সত্য উচ্চারণ (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া : বিবেকী সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পথিকৃৎ, ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩)।

মিঠেকড়া, ভীমরুল
এই কলামটির ধারক ছিলেন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক আহমেদুর রহমান। আহমেদুর রহমান শুধু একজন সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন সমাজে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার অগ্রণী সৈনিক এবং গণমানুষের মুক্তিতে আস্থাশীল। সম্প্রতি (২৪ নভেম্বর ২০২৩) এই লেখকের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় ভাষা-সংগ্রামী ও রবীন্দ্রগবেষক-বিশেষজ্ঞ আহমদ রফিক উল্লেখ করেছেন, “আহমেদুর রহমান ছিলেন খুবই প্রতিভাবান একজন সাংবাদিক ও বাম ঘরানায় বিশ্বাসী মানুষ।”

ঘরে বাইরে, সন্ধানী
‘ঘরে বাইরে’ কলামে ‘সন্ধানী’ নামে লিখতেন আহমেদুর রহমানেরই অনুজ হাবিবুর রহমান মিলন। তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর পর ১৯৬৫ সালে তিনি ইত্তেফাকে যোগদান করেন। পরে পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদকও হয়েছিলেন তিনি। তাঁর লেখাও এতোটাই শক্তিমত্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, সহজেই যে কোনো পাঠক বলে দিতেন, উভয়ের ধমনিতে যে একই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০১২ সালে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।

দশ দিগন্ত, পদাতিক
সংক্ষিপ্ত ‘আগাচৌ’ নামে পরিচিত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বিখ্যাত ছিলেন ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির জন্যই। ইত্তেফাকে তাঁর কলামটির নাম ছিল ‘দশ দিগন্ত’, সেডোনিম (Pseudonym) ‘পদাতিক’। তিনি ১৯৬৭ সালে ছোটগল্পের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সাহিত্যের জন্য একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার এবং সাংবাদিকতায় ‘মানিক মিয়া পদক’ লাভ করেছিলেন।

স্থান-কাল-পাত্র, লুব্ধক
‘লুব্ধক’ বলতে আকাশের উজ্জ্বলতম তারাটিকে বোঝায়। আখতার-উল্ আলমও তেমনি ‘স্থান-কাল-পাত্র’র প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ‘লুব্ধক’ নাম ধারণ করে তারার সেই জ্যোতি ছড়াতে সচেষ্ট ছিলেন। প্রথিতযশা সাংবাদিক, কলামিস্ট ও কূটনীতিক আখতার-উল্ আলম ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও হয়েছিলেন। তিনি একবার বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছিলেন। অনুবাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। তাঁর অনূদিত ফরাসি বিজ্ঞানী ড. মরিস বুকাইলির ‘বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান’ একটি সাড়া জাগানো অনুবাদগ্রন্থ।

নিবেদন ইতি, অভাজন
‘অভাজন’ হিসেবে ‘নিবেদন ইতি’র রচক আবেদ খান ১৯৬৪ সালে ইত্তেফাকে যোগদান করেছিলেন সহ-সম্পাদক হিসেবে। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির প্রধান প্রতিবেদক, সহকারী সম্পাদক ও কলামিস্ট। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাস থেকে ইত্তেফাকে তাঁর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘ওপেন সিক্রেট’ প্রকাশিত হয়েছিল। স্বাধীন সাংবাদিকতা বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখের দাবিদার। তাঁর কলাম-সংকলন ‘অভাজনের নিবেদন ইতি’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।

মঞ্চে নেপথ্যে, স্পষ্টভাষী
‘মঞ্চে নেপথ্যে’র ‘স্পষ্টভাষী’ ছিলেন খন্দকার আবদুল হামিদ। তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক ও রাজনীতিক। যুক্তফ্রন্টের অধীনে ১৯৫৪ সালে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ আমলে খন্দকার আবদুল হামিদ একাধিকবার মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ইত্তেফাকে তিনি যোগদান করেন স্বাধীনতার পরে, ১৯৭৩ সালে। সাংবাদিকতায় অবদান রাখার জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে একুশে পদক অর্জন করেছিলেন। প্রায় ৪০ বছর তিনি দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন।

চতুরঙ্গ, সুহৃদ
কথাসাহিত্যিক রাহাত খানের পেশা ছিল সাংবাদিকতা, যিনি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ‘সুহৃদ’, আর কলামের নাম ‘চতুরঙ্গ’। সহকারী সম্পাদক হিসেবে ইত্তেফাকে তিনি যোগদান করেন ১৯৬৯ সালে, কাজ করেছেন চার দশক ধরে। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন বহু আগেই, ১৯৭৩ সালে, যখন তিনি ছোটগল্পের জন্য লাভ করেছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

প্রিয় অপ্রিয়, সত্যদর্শী
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী কালের অন্যতম প্রধান কবি মহাদেব সাহা ইত্তেফাকে কলাম লিখতেন ‘সত্যদর্শী’ নামে, যাঁর কলামটির নাম ছিল ‘প্রিয় অপ্রিয়’। মহাদেব সাহার সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, তারপর দীর্ঘদিন তিনি ইত্তেফাকের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। কবিতায় তাঁর অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন।

দিক দিগন্ত, পর্যবেক্ষক
ভাষা-সংগ্রামী হাসান ইকবাল দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগে টানা ৪৮ বছর কর্মরত ছিলেন। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির সহকারী সম্পাদক। তিনি ‘দিক দিগন্ত’ নামে যে কলামটি লিখতেন সেই নামে তাঁর একটি গ্রন্থও রয়েছে।

একটি পত্রিকার দায়িত্ব কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, কিংবা কয়েকজন দেশি-বিদেশি লেখকের মূল বা অনুবাদ লেখা নিয়মিত মুদ্রণ নয়—পত্রিকার ভূমিকা অনেক ব্যাপক এবং পরাধীন দেশ থেকে স্বাধীন দেশে এই ভূমিকা পালটেও যায়। যাঁরা নিয়মিত কলাম লেখেন তাঁদের সঙ্গে পাঠকের একটি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, লেখক-পাঠকের এই রসায়ন অনবদ্য। এটি তৈরি হয় সিরিয়াস লেখার মধ্য দিয়ে, যখন পাঠক ভাবেন এ তো আমারই কথা কিংবা এর চেয়ে বড় সত্য আর হয় না ইত্যাদি। এইসব সিরিয়াস ও নির্ভেজাল সত্য প্রকাশার্থেই ইত্তেফাকের কলামিস্টরা ছদ্মনামের আশ্রয় নিতেন। কিন্তু আজ কেন এই ধারা হারিয়ে গেল, কেন এর ধারাবাহিকতা রক্ষিত হলো না?

পত্রিকা হিসেবে আজকের মহিরুহ ইত্তেফাকের সকল কলমযোদ্ধার প্রতি নিবেদন করছি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক 

ইত্তেফাক/এসটিএম